ছোট গল্প

আপেল

খুশির সাথে আমার প্রেম হয়েছে তিন মাসের বেশি হয়ে গেল। এখনও দুজনের মাঝে খুব একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠেনি। পরস্পরের তেমন কাছে যেতে পারিনি আমরা। অথচ আজকের এই মডার্ন বাংলাদেশে এমনটা সচরাচর ঘটতে দেখা যায়না!

এর প্রধান কারণ হচ্ছে খুশির রক্ষণশীল ভাব-ভঙ্গি। একসাথে ঘুরতে বের হলে খুশির হাত ধরতেও আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়। সে সহজে হাত ধরতে চায় না, আমি ধরলেও কিছুক্ষন পর ছাড়িয়ে নেয়। কোথাও গিয়ে বসলে খুশি সব সময় আমার কাছ থেকে সামান্য একটু দূরত্ব বজায় রাখে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম খুশি বোধহয় একটু লাজুক স্বভাবের। কিন্তু পরে মনে হয়েছে মেয়েটি কেমন যেন পানসে! স্বাভাবিক রসবোধও তার মধ্যে নেই! ভাবছিলাম ওর সাথে সম্পর্কটা ভেঙেই দিব। এভাবে রস-কষহীন প্রেম করে আর পোষাচ্ছে না!

ঠিক তখনই এই সুযোগটা এল! অন্তরঙ্গতা বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ! তিনমাসের কষ্টের পর আজ প্রথম একটু চিড়ে ভিজতে চলেছে। খুব আনন্দ হচ্ছে! আমি যাচ্ছি খুশির বাসায়। আনন্দের কারণটা হল – খুশি একটা ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ একা থাকে!

ভাবছেন এটা কি করে সম্ভব হল? যে মেয়েটির হাত ধরতেও আমাকে এতটা বেগ পেতে হয় সে কেন আজ আমাকে নির্জন বাড়িতে আসার অনুমতি দিল? বলছি…

আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম দুজনের মধ্যে এই দূরত্বটুকু দূর করার জন্য একদম নির্জনে একান্তে কিছুটা সময় কাটানো দরকার। তাই সেদিন খুশিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার বাসা কি কখনও খালি থাকেনা, খুশি?”

খুশি উত্তর দিল, “না, কারণ আমার ফ্যামিলির অনেক সদস্য। কেউ না কেউ সব সময় বাসায় থাকে”।

আমি মুখ বেজার করে বললাম, “আমার খুব ইচ্ছে করছিল নির্জনে তোমার সাথে বসে একটু সময় কাটাব, যেখানে কেউ থাকবে না। তোমার বাসা কখনও খালি থাকলে বলবে। আমি চলে আসব”।
খুশির ঠোঁটে হালকা একটু হাসির রেখা দেখা দিল, “এমন সুযোগ তো সব সময়ই পাওয়া যাবে। আমি আমার ফ্ল্যাটে একাই থাকি। আমাদের বাসায় এক একজন সদস্য এক একটা ফ্ল্যাটে আলাদা থাকে। শুধু খাওয়ার সময় হলে সবাই এক সাথে বসে খাই”।

অদ্ভুত! পরিবারের এক একজন সম্পূর্ণ একটা ফ্ল্যাট নিয়ে আলাদা থাকে! বড়লোকের অদ্ভুত কারবার! যাই হোক, খুশির সাথে নির্জনে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছি! আর কি লাগে! আমি একটা ফুলের তোরা হাতে নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে যাচ্ছি খুশিদের বাসায়। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাশে…

খুশিদের বিশাল প্রাসাদসম বাড়ি। গেট দিয়ে ঢোকার সময় কোন বাঁধা এল না। দাড়োয়ানটা কেমন যেন রোবটের মত বসে আছে! নড়েও না, চড়েও না! মনে হয় আমার আসার কথা তাকে আগেই বলে রেখেছিল খুশি।

খুশির ফ্ল্যাটটা বাড়ির নিচ তলায় ডান দিকে। চিনতে অসুবিধা হল না। আমি কলিং বেল চাপার প্রায় সাথে সাথেই খুশি খুলে দিল। ফুলের তোরাটা বাড়িয়ে ধরলাম তার দিকে। বললাম, “আমার প্রাণপ্রিয় প্রিয়তমা। এই নাও তোমার প্রেমিকের পক্ষ থেকে এই সামান্য উপহার”।

খুশি হাত বাড়িয়ে ফুলের তোরাটা নিল। খুব সুন্দর করে হাসল।

বাব্বাহ! মেয়েটি এত্ত সুন্দর করে হাসতে জানে! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি খুশিকে! আগে তো কখনও তাকে এভাবে হাসতে দেখিনি!

“ভেতরে এস”। বলে এক পাশে সরে গেল খুশি। আমি পা দিলাম বিশাল এক বিলাশ বহুল ফ্ল্যাটের ভেতরে। খুশি আমাকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা একটা ড্রয়িং রুমের ভেতর নিয়ে আসল।

আমাকে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেল সে। ফিরল একটা বাটি, দুইটা আপেল আর একটা ফল কাটার চাকু নিয়ে। ঠিক ফল কাটার চাকু নয়, একটু বড় আকৃতির। খুশিকে মনে হল অতিথি আপ্যায়নের কাজে বেশ আনাড়ি। হবেই বা না কেন? বড়লোকের আদুরে মেয়ে যে!

খুশি আমার দিকে পেছন ফিরে আপেল কাটছে। আমি এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরলাম।

খুশি মৃদু আপত্তি জানাল, “কি করছ এসব?”

আমি সমস্ত মায়া ঢেলে দিলাম কণ্ঠে, “আমার প্রানপাখিটাকে আদর করছি”।

“ছাড় তো”! খুশির কণ্ঠে আদরের নিষেধ।

আমি খুশির আপত্তি শুনছি না। টের পেলার ধীরে ধীরে আমার উত্তেজনা বাড়ছে। আমার হাত দুটো খুশির কোমর ছাড়িয়ে একটু একটু করে উপরে উঠছে। খুশি হঠাৎ বাধা দিল আমাকে। এক হাতে আমার হাতদুটোর গতি রোধ করে বলল, “অমন করোনা তো! এই বাসার দেয়ালগুলোর কিন্তু চোখ আছে!”

আমি খুশিকে ছেড়ে দিলাম। ওর কথায় বেশ মজা পেয়েছি। আমি তো দেখি ভুল বুঝেছিলাম। মেয়েটির মধ্যে ভালই হাস্যরস আছে! দুষ্টুমির হাসি হেসে বললাম, “তাই নাকি? তো দেয়ালের কি শুধু চোখই আছে? কান নেই? আমাদের কথা শুনে ফেলছে না”।

“না, বাড়িটা বানানোর সময় আমার বাবা দেয়ালগুলোতে কান দেয় নি, শুধু চোখ দিয়েছেন”।
এমন একটা রসিকতা কেউ এতটা নির্লিপ্ত থেকে করতে পারে, না শুনলে বিশ্বাসই করতাম না! আমি তো হেসেই খুন, “হা হা হা! খুশি! তুমি তো ভালই মজা করতে পার! বাইরের তুমি আর বাসার ভেতরের তুমির মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ”!

খুশি আর কিছু বলছে না। আপেল কাঁটায় তার পূর্ণ মনোযোগ।

আমি একটা সোফায় এসে আরাম করে বসলাম। খুশিকে দেখছি পেছন দিক থেকে। ট্রাউজার আর টি-শার্ট পড়ে আছে। গলায় অযত্নে ঝুলিয়ে রাখা স্কাফটা বুকের সৌন্দর্য আটকে রাখতে পারেনি। মেয়েটির ফিগার যেন কোন নিপুণ শিল্পি দক্ষ হাতে একটু একটু করে গড়েছে। কোথাও এক ফোঁটা কম বা বেশি নেই। যতটা দরকার ঠিক ততটাই দিয়েছেন। ঐ চিকন কোমরের ভাজের কাছে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য পরাজয় মেনে নেবে। আর নিতম্বের হালকা কাঁপনের কথা নাই বা বললাম! তাকিয়ে থাকতে থাকতে টের পেলার আমার বুকের ভেতর হার্ট বিট বেড়ে গেছে! এত সুন্দর একটা মেয়ে আমার গার্লফ্রেন্ড! নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে দিতে ইচ্ছে করছে আমার।

খুশির আপেল কাটা হয়েছে। সে আপেলের বাটিটা নিয়ে এসে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরল। বলল, “বাসায় আর কোন খাবার নেই। এই আপেলগুলো খেয়ে নাও”।

“তারপর কি হবে শুনি? ইঙ্গিতপূর্ণ কণ্ঠে বললাম আমি।

“তারপর…” খুশি একটু আমতা আমতা করছে। “আগে খাওয়া শেষ কর। তারপর দেখাব…”

আমি আপন মনে আপেল খাচ্ছি আর খুশিকে দেখছি। খানিকক্ষন পর পর পুলক জাগছে আমার সমস্ত শরীরে! কি ভাগ্য আমার! বড়লোকের আদুরে, অপরূপ রূপসী একটা মেয়ে পটিয়ে ফেলেছি। কিন্তু কাজ এখনও শেষ হয়নি! খেলা এখনও বাকি! যেভাবেই হোক, বেঁধে ফেলতে হবে এই মেয়েকে। বিয়েটা সেড়ে ফেলতে পারলেই আমাকে আর পায় কে!

হঠাৎ মনে হল বুঝি খুশির পেছনের দেয়ালটা একটু অন্ধকার হয়েই আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল! অনেকটা যেন চোখের পলক পড়ল! আমি দেয়াল থেকে চোখ ফিরিয়ে খুশির দিকে ফিরলাম। খুশি অদ্ভুত ভঙ্গিতে ছুরিটা হাতে ধরে আছে। তার মুখে হাসি, চিরায়ত কোন হাসি নয়। এই হাসির ভঙ্গি আমার অচেনা! জানিনা কারা এভাবে হাসে!

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। “ছু… ছুরিটা এখনও হাতে রেখেছ কেন? যাও রেখে এস”।

“রাখার কি দরকার?” খুশি তার মুখের অদ্ভুত হাসিটা ধরে রেখেই বলল, “এটা এখনই কাজে লাগবে”!

“কি… কি কাজে লাগবে?”

“খাবার কাটব। অনেক খাবার!”

“মানে? কিসের খাবার?”

“আর কিছুক্ষন পরই আমার পরিবারের সদস্যের ঘুম ভাঙবে। দুদিন ধরে ঘুমুচ্ছে সবাই, উঠেই খেতে চাইবে। ওদের জন্য খাবার রেডি রাখতে হবে”। এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল খুশি।

“কি… কি… কি বলছ?” আমার তোতলামি বেড়ে গেল।

“তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। হাতে সময় নেই আমার! ওদের খাবারের জন্যই তোমাকে এখানে আসতে বলেছি আজ”।

“তা.. তারমানে?”

“এই ছুরিটা দিয়ে তোমাকে আমি আজ কুচি কুচি করে কাটব”। খুশির কণ্ঠ নির্লিপ্ত। “তারপর আমরা সবাই মিলে খাব”।

খুশি নিশ্চয়ই ফাজলামো করছে! আমি হেসে ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করলাম, “হা হা হা! তাই নাকি? খাবে আমাকে? আচ্ছা দেখি কত খেতে পার…”

আমি ভাবছিলাম খুব জোরে জোরে অনেকক্ষন ধরে হাসব। কিন্তু খুশির চেহারা দেখে আমার মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। খুশিকে এতটা খুশি হতে আগে কখনও দেখিনি আমি! তার চোখদুটো বলছে- সে মিথ্যা বলছে না! এই চোখ মানুষের চোখ নয়! মানুষ খেকো পিশাচ যেন!

খুশি এক অপার্থিব সুরে বলে উঠল, “ভয় পেয়োনা! অতিথি আপ্যায়নে আমরা কার্পণ্য করিনা। তোমার খাওয়া শেষ হওয়ার আগে তোমাকে কিছু করব না!”

আমি একটা ঢোক গিললাম। শিরদাঁড়া বেয়ে আতংকের ঢেউ নামছে। প্লেটের দিকে তাকালাম। আর মাত্র দুই পিস আপেল খাওয়া বাকি আছে…

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি