বড় গল্প

দস্যুকন্যা

আগুন সুন্দরী একটি মেয়ের হাতে পিস্তল ধরিয়ে দিলে তার সৌন্দর্য দশগুণ বেড়ে যায়- এই তথ্যটা আমার জানা ছিলো না। রূপবতী মেয়েদের আমি সাধারণত রজনীগন্ধা, গোলাপ কিংবা দামী ভ্যানিটি ব্যাগ হাতে দেখে অভ্যস্ত, অস্ত্র হাতে নয়! সুযোগটা পেয়ে গেলাম একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে! না, আমি কোন সিনেমার শুটিং এর কথা বলছি না। এটা একটা বাস্তব ঘটনা!

ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ পেছনে চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনলাম। “ঠাশ” করে একটা আওয়াজ হলো। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একজন কালো জ্যাকেট পড়া লোক ব্যাংকের গার্ডকে ধরে মারছে। প্রথমে ভাবলাম লোকটা সম্ভবত কোন উচ্চপদস্থঃ কর্মকর্তা। গার্ড বেচারা তাকে সালাম দিতে ভুলে গেছে, তাই সুযোগ পেয়ে সে নিজের পাওয়ার দেখাচ্ছে। কিন্তু পর মুহুর্তে লোকটা গার্ডের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিতেই সবাই আতংকিত হয়ে পড়লো। এদিক সেদিক ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো।

এরই মধ্যে দেখা গেলো একজন লুঙ্গি পড়া লোক দোনলা বন্দুক হাতে ব্যাংকের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। শার্ট প্যান্ট আর সানগ্লাস পড়া একজনের হাতে দেখা দিলো মেশিন গান। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- লাল-সাদা সালোয়ার কামিজ পড়া অপরুপ সুন্দর একটি মেয়েও তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা ছোট আকৃতির পিস্তল বের করে হাতে নিয়েছে! অর্থাৎ, ব্যাংকে ডাকাতি হতে চলেছে! কিছুদিন যাবত দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের ব্যাংকগুলোতে কিছু সংঘবদ্ধ ডাকাতদল হামলা চালাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হলো না- এরা সেই দলেরই লোক!

মুহুর্তের মধ্যে হৈচৈ, কান্না-কাটি শুরু হয়ে গেলো ব্যাংকের ভেতর। যে যেদিকে পারছে দৌড়াচ্ছে। আমিও জানের ভয়ে দৌড়ে গিয়ে কয়েকটা চেয়ারের আড়ালে গা ঢাকা দিলাম। কালো জ্যাকেট পড়া লোকটা সমানে এগিয়ে এলো, সম্ভবত সে এই ডাকাত দলটির লিডার। চিৎকার করে বললো, “কেউ নড়া চড়া করবি না! আমরা গডফাদার শমসের এর লোক! যে যেখানে আসছ, দাঁড়ায়ে থাক। নাইলে জানে মাইরা ফালামু!”

কে শোনে কার কথা? ব্যাংকের ভেতর সাধারণ লোকজন আর ব্যাংকের কর্মচারিদের হুড়োহুড়ি চলছে। কে কোথায় লুকাবে সেই পথ খুঁজছে! তাই দেখে লিডার এবার অন্য পন্থা অবলম্বন করলো। সিলিং এর দিকে বন্দুক তাক করে ফাঁকা গুলি ছুড়লো! ব্যাস! যে যেখানে ছিলো, ভয়ে জমে গেলো। লিডারের মুখে হাসি ফুটলো এবার। বোঝা যাচ্ছে যে তারা বেশ প্ল্যান করেই এসেছে। ছোট শহরের ছোট্ট একটা ব্যাংক। অল্প কিছু মানুষ কাজ করে, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও খুব খারাপ। সবচেয়ে কাছের পুলিশ ষ্টেশনটাও এখান থেকে অনেক দূরে! নির্বিঘ্নে ডাকাতি করার সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে ভালো ভাবেই।

গডফাদার শমসের এই অঞ্চলের এক ত্রাসের নাম। তার দলে কোন আনাড়ি গুন্ডা পান্ডা নেই! সবাই রীতিমত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এই মুহুর্তে তার প্রমান নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছি! ব্যাংকে হামলাকারি এই লোকগুলো খুব সতর্ক। প্রতিটি পদক্ষেপ সাবধানে ফেলছে। মোট চারজন। প্রথমেই ওরা ব্যাংকের দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দিলো। একজন পিস্তল হাতে দরজার সামনে পাহাড়ায় থাকলো। লিডার লোকটা গেলো ব্যাংকের ম্যানেজারের রুমে। বাকি দুইজন ব্যাংকের সমস্ত কর্মচারি এবং সাধারণ লোকদের একটা যায়গায় নিয়ে জড়ো করলো। এই দুইজনের একজন সেই আগুন সুন্দরী! এমন মেয়ে ডাকাত হয় কি করে? আমার তো মাথায় আসছে না!

মেয়েটির সাথে চোখাচোখি হতেই ঝড় বয়ে গেলো আমার বুকের ভেতরে। মনে হলো এক ঝাঁক আগুনের ফুলকি উড়ে এসে আমার চোখ দুটো ঝলসে দিলো! গ্রিক দেবীর মতো টানা টানা চোখ, চোখের মনি নীলচে বর্ণের, বড় বড় পাপড়ি। মানুষের চোখ এতো সুন্দর হয়, জানা ছিলো না!

“খবরদার, যে যেইখানে দাঁড়ায় আছেন, সেখানেই থাকেন। কেউ নড়া চড়া করবেন না। কাউরে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। কেউ কথা না শুনলে কপালে একটা ফুটা কইরা দিবো”।

সবাই ভয়ে জমে গেছে। নড়া চড়া তো চাইলেও করতে পারবে না! কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে- আমি মুখে হাসি নিয়ে অপলক তাকিয়ে আছি মেয়েটির দিকে। তাকে দেখে ভয় কম, বিস্ময় আর মুগ্ধতা বেশি অনুভূত হচ্ছে আমার!

মেয়েটি তার পাশের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো, “মনসুর ভাই, সবার কাছ থেইকা মোবাইলগুলা নিয়া নেন তো”।

মনসুর নামের লোকটি এগিয়ে এলো। এই লোকটা দলের অন্য সবার চেয়ে একটু বয়স্ক। প্রথমে সে আমার সামনে এসে হাত পাতলো। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে মোবাইলটা তার হাতে তুলে দিলাম। বাষট্টি হাজার টাকা দামের মোবাইলটা সে মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেললো। এভাবে পালাক্রমে সবার মোবাইল ভাঙতে শুরু করলো।

আমার চোখের দৃষ্টির সামনে মেয়েটি সম্ভবত একটু অস্বস্তি বোধ করছে। চেঁচিয়ে বললো, “ঐ পোলা! কি দেখতাছস?”

“তোমাকে”। অকপটে বলে দিলাম আমি।

আমার উত্তর শুনে মেয়েটির মুখ হা হয়ে গেলো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “তোর তো সাহস কম না! আমার হাতে এইটারে কি খেলনা পিস্তল মনে করসোস?”

“না, আমি জানি ওটা সত্যিকারের পিস্তল”।

“তারপরও তোর ভয় লাগতাছে না?”

আমি না-বোধক মাথা নাড়লাম।

“তুই কি পাগল?” মেয়েটি পিস্তল উচিয়ে দুই পা এগিয়ে এলো।

আমি হাসলাম, “পাগল বলা যায়। স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি আমার মধ্যে একটু কম!”

মেয়েটি আশে পাশে তাকাচ্ছে। অপ্রস্তুত বোধ করছে। সে সম্ভবত আশা করেনি কেউ তার হাতে পিস্তল দেখা সত্ত্বেও সাহস করে এই ধরনের কথা বলতে পারে! মেয়েটির আচরণেই বুঝা যাচ্ছে সে এই লাইনে নতুন। পুরনো কেউ হলে এতো কথা না বলে ডাইরেক্ট গুলি করে দিতো। কিন্তু এই মেয়েটি আর যাই করুক, কাউকে গুলি করার সাহস রাখে না!

আমি আরও একটু সাহসী হলাম এবার, “তোমার চোখ দুটো অপরূপ সুন্দর!”

“চুপ কর হারামযাদা।” মেয়েটি নিজের অস্বস্তি দূর করতে অতিরিক্ত চিৎকার করছে। “নাইলে গুলি কইরা তোর পেট ফুটা কইরা দিমু”।

“তোমার কি মনে হয় মৃত্যুর ভয় আমার আছে?” আমি টিটকারির ভঙ্গিতে হাসলাম।

মেয়েটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তার দুচোখে আজন্ম বিস্ময়। সে হয়তো ভাবতে পারেনি যে মৃত্যুর ভয় নেই এমন লোকও পৃথিবীতে আছে!

আমি নির্বিকার চিত্তে বলে গেলাম, “গত এক বছর যাবত আমি আত্মহত্যা করার চিন্তা করছি। প্রতিদিনই মৃত্যুর প্রস্তুতি নেই। কিন্তু কেন যেন মরা হয়ে ওঠে না! জীবন নিজ হাতে শেষ করে দেওয়ার মধ্যে কোন আনন্দ নেই! তারচেয়ে তোমার হাতে মরতে পারলে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হবে আমার! করো একটা গুলি! পেটে নয়, বুকের বাম পাশে করো!”

ব্যাংকের ম্যানেজারের রুম থেকে “ঠাস” করে একটা আওয়াজ এলো। সাথে সাথে বয়স্ক পুরুষের চিৎকার শোনা গেলো। কয়েক সেকেন্ড পর ম্যানেজার এক হাত দিয়ে অন্য হাতের বাহু ধরে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। চোখে মুখে যন্ত্রণার ছাপ। হাত ভেসে যাচ্ছে রক্তে। পেছন পেছন বেরিয়ে এলো কালো জ্যাকেট পড়া লিডার। সম্ভবত ব্যাংকের ভল্টের দিকে যাচ্ছে। ম্যানেজার শুরুতে আপত্তি করায় গুলি করেছে।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লিডার লোকটা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “বইন, সব ঠিক ঠাক আছে?”

মেয়েটি একটু হেসে বলল, “জি ভাইজান।“

“তুই আর মনসুর ভাই মিল্লা লোকজনের দিকে নজর রাখ”। তারপর দরজার সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো, “রুবেল, তুই চোখ কান খোলা রাখ। বাইরেও নজর রাখ। আমি টেকা পয়সা সব ব্যাগে ভইরা নিতাছি”।

রুবেল হ্যা-বোধক মাথা নাড়লো। ম্যানেজারকে নিয়ে করিডোর ধরে এগিয়ে গেলো লিডার।

লিডার অদৃশ্য হতেই মেয়েটি আমার দিকে তাকালো। অপেক্ষাকৃত নরম কণ্ঠে বললো, “আ… আপনি মরতে চান কেন? কিসের অভাব আপনের?”

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “আসলে… আমার জীবনে বেঁচে থাকার মতো কিছুই নেই। জন্মের কিছুদিন পরেই বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপর তারা উভয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। আমি কিছুদিন বাবার কাছে, কিছুদিন মায়ের কাছে থেকে বড় হয়েছি। দুজনেই বিশাল বড়লোক। ছোটবেলা থেকেই যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। বাড়ি-গাড়ি-ব্যাংক ব্যালেন্স! কোন কিছুর অভাব নেই! পিতা মাতার যা আছে তা আজীবন উড়িয়েও শেষ করতে পারব না! এই জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে কোন আনন্দ নেই!”

“এই জন্য মরতে হবে?”

“মৃত্যুর স্বাদ বাদে সব কিছুই পাওয়া হয়ে গেছে আমার… আমার বাবা-মায়ের মতে আমি হচ্ছি তাদের জীবনের একটা নোংরা অধ্যায়। না পারে রাখতে, না পারে ফেলে দিতে! আমার কোন বন্ধু নেই, কারো সাথে মিশতে পারি না, কেউ আমাকে পছন্দ করে না! সময় কাঁটাতে নেশা করতাম, মেয়ে মানুষ নিয়ে ফুর্তি করতাম, আরও কত বাজে কাজ করেছি! এসবেও এখন আগ্রহ হয় না! এই জীবন থেকে মুক্তির এখন একটাই রাস্তা- মৃত্যু! কিন্তু আত্মহত্যার মৃত্যু হচ্ছে সবচেয়ে বোরিং! যার জীবনটাই কেটেছে বোরিং, তার মৃত্যুটাও বোরিং হলে কীভাবে হবে? তাই নিজের মৃত্যুটাকে মিনিংফুল করার উপায় খুঁজছিলাম আমি। অবশেষে সেই সুযোগ পেয়েছি! একজন রূপবতী দস্যুকন্যার হাতে মৃত্যু! এর চেয়ে এক্সাইটিং আর কি হতে পারে? মেরে ফেলো আমাকে…”

“ঐ পোলা! বিরক্ত করিস না তো”।

কথাটা এলো পেছন থেকে। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম মনসুর ডাকাত দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। আমি একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হেসে বললাম, “আমাকে আপনাদের দলে নিবেন?”

মনসুরের চেহারা দেখে মনে হলো চিরতার পানি খেয়েছে। “কি কইলি রে?”

“আমাকে আপনাদের দলে নিবেন? আমি ডাকাত হতে চাই”।

মনসুর রেগে মেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় লিডারের কণ্ঠস্বর শোনা গেলো, “চল সবাই। কাজ শেষ!”

আমি ঘার ঘুরিয়ে সেদিকে তাকালাম। লিডারের কাঁধ থেকে ঝুলছে একটা কালো ব্যাগপ্যাক। হাতেও একটা বড় সাইজের ব্যাগ। তার মুখের হাসি এক কান থেকে আরেক কানে গিয়ে ঠেকেছে। বুঝাই যাচ্ছে- অন্তত পঞ্চাশ লাখ লুট করেছে আজ।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রুবেল এগিয়ে এলো, “উস্তাদ, সর্বনাশ হইছে। পুলিশ খবর পাইয়া গেছে! চারিদিক থেইকা আমাগোরে ঘিরা ফালাইছে!”

“কস কি? পুলিশে খবর দিলো কে?”

“জানি না উস্তাদ!” রুবেলের কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। “ব্যাংকের কোন কর্মচারি টয়লেটে লুকাইয়া পুলিশে ফোন দিয়া দিছে মনে হয়”।

“কাছেই জঙ্গল আছে, বাইর হইয়া চল গাঁ ঢাকা দেই”।

“সম্ভব না উস্তাদ। ব্যাংকের দরজা এই একটাই। পুলিশ পজিশন নিয়া রাখছে। বাইরে বের হইলেই গুলি করবো”।

লিডার মুষড়ে পড়লো আতংকে। “এখন উপায় কি?”

ডাকাতরা কেউ কিছু বলছে না। সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে।

আমি সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠলাম, “উপায় আছে”।

মুহুর্তের মধ্যে চারজন ডাকাতের চোখ ঘুরে গেলো আমার দিকে। আমি দৃঢ় ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে এলাম। বুকে হাত দিয়ে বাঁধা দিল মনসুর ডাকাত। “ঐ পোলা! তোর সাহস তো কম না! দূরে সর!”

লিডার বললো, “ওরে আসতে দেও ভাই”।

মনসুর আমার চোখে চোখ রেখে হাত সরিয়ে নিলো। রাগে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে এলাম আমি। লিডারের মুখোমুখি দাঁড়ালাম।

“কি উপায় আছে বল?” লিডার জিজ্ঞেস করলো।

“আমাকে জিম্মি করেন”।

“কি?”

আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, “আমি অনেক বড় ব্যবসায়ীর ছেলে। আমার পিতার রাজনৈতিক পাওয়ার আছে। আপনারা আমাকে জিম্মি করে সাথে নিয়ে যান। পুলিশ কিছুতেই আপনাদের গুলি করার ঝুঁকি নেবে না!”

“ঐ পোলা ভাগ…” বলে পেছন থেকে আমাকে হাত ধরে হ্যাচকা টানে সরিয়ে দিলো মনসুর। লিডারের দিকে তাকিয়ে বলল, “জলিল, তুমি এর কথা শুইনো না। বড়লোকের পাগল-ছাগল পোলা। দুনিয়া বুঝে না। মনে করছে আমরা এইখানে গেম খেলতাছি।”

“মনসুর ভাই…” বাঁধা দিলো ডাকাত সর্দার জলিল। “ওর কথা ঠিক আছে। একজন জিম্মি লগে নিলে পুলিশ কোন রিস্ক নিব বইলা মনে হয় না”।
এবার রুবেল ডাকাত বলল, “কোনমতে একবার বাইর হইয়া গাড়িতে উঠতে পারলেই হয়। এরপর বাইর কইরা নিয়া যাইতে পারুম”।

***

এরপরের ঘটনাগুলো হলিউডের থ্রিলার মুভির মতো পর পর ঘটতে থাকলো। আমাকে সামনে রেখে তারা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এলো। পুলিশ অবস্থান নিয়েছিল গেটে। কিন্তু সিভিলিয়ান জিম্মি দেখে তারা ঝুঁকি নিতে পারলো না। ব্যাংকের সামনেই একটা মাইক্রো বাস পার্ক করা ছিল। ডাকাত দলটা এই গাড়িতেই এসেছে। তারা আমাকে নিয়ে সাবধানে গাড়িতে উঠে গেলো। রুবেল বসলো ড্রাইভারের সিটে। আমাকে মাঝে নিয়ে বসলো ডাকাত লিডার আর মনসুর। মুখোমুখি বসলো দস্যুকন্যা। আমাদের পিছু নিয়েছিল পুলিশের কয়েকটা গাড়ি। কিন্তু সুবিধা করতে পারলো না। মাইক্রো বাসটা মনে হচ্ছে কাস্টোমাইজড ইঞ্জিন বসানো হয়েছে। নইলে এতো বেশি স্পিডে ছুটতে পারার তো কথা না! শহরের মূল রাস্তা পার হয়েই রং সাইডে ঢুকে গেলো রুবেল। তারপর কাঁচাবাজারের মাঝের রাস্তা ধরেই দে ছুট। বুঝলাম গাড়ি নিয়ে পালানোয় রুবেলের কোন তুলনা হয় না! ডাকাতি পেশায় আসার আগে মনে হয় গাড়ি চোর ছিলো! বাজার পার হয়ে ময়মনসিংহের দিকে যাওয়ার রাস্তায় উঠে এলো গাড়ি। এবার আর পায় কে? সামনে খোলা রাস্তা, ফুল স্পিডে ছুটলো গাড়ি। ওদিকে পুলিশের গাড়িগুলো বাজারের ভেতর ঢুকেই জ্যামে আটকে গেছে। আমাদের বাঁধা দেওয়ার আর কেউ নেই!

“পোলাটারে নিয়া কি করুম?” মনসুর ডাকাত জিজ্ঞেস করলো।

জলিল বললো, “বড় রাস্তাটা পার হওয়ার পর সামনে ঘন জঙ্গল আছে। ঐখানে গাড়ি থামাইবো রুবেল। তখনই যা করার করুম”।
আমি বুঝতে পারলাম কী দুরভীসন্ধি চলছে লিডারের মাথায়। অনুনয় করে বললাম, “ওস্তাদ, আমি আপনাদের দলে অন্তর্ভূক্ত হতে চাই।”
জলিল খিক খিক করে হাসলো, “তোরে দিয়া আমার হইবডা কি?”

“ভাই, আমাকে শিখিয়ে দিলে সব কাজ করতে পারব। প্লিজ আমাকে সুযোগ দিন”।

জলিল কোন উত্তর দিলো না। নীরবে হাসছে।

“ভাইজান…” সম্মুখে বসা দস্যুকন্যা মুখ খুললো এইবার। “এই কাজ কইরো না”।

“মৌরী, তোর এইগুলা দেখা লাগবো না”। রাগী কণ্ঠে বলল জলিল। “এইটা আমারে সামলাইতে দে”।

মৌরী! দস্যুকন্যার নামটাও ভারি সুন্দর! বিপদের কথা ভুলে আমার মুখে হাসি ফুটলো।

“ভাইজান!” মৌরীর কণ্ঠে অনুনয়। “পোলাটা আমাগোরে বিপদের হাত থেইকা বাঁচাইছে”।

“সামনে আরও বড় বিপদে ফেলবো”। জলিল বোঝানোর চেষ্টা করলো, “বইন, তুই না আমার মত বড় ডাকাইত হইতে চাস? তুই যদি এমন দয়া মায়া দেখাস তাইলে হইব? এই লাইনে কাজ করতে হয় মাথা খাটাইয়া, দয়ার কোন যায়গা নাই”।

মৌরীর চেহারা দেখা মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। তার চোখের কোনে মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু ঝিলিক মারছে। দৃশ্যটা দেখে খুব ভালো লাগছে। আমার ধারণা ছিল আমার মৃত্যুতে কেউ কাঁদবে না। কিন্তু জীবিত অবস্থাতেই দেখছি আমার জন্য কেউ একজন অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে! এই জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া কি হতে পারে?

আমি ডাকাত সর্দার জলিল আর তার বোন মৌরীর বিষয়টা ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করলাম। সম্ভবত এরা অনেক ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে স্ট্রাগল করতে করতে বড় হয়েছে। বড়ভাইটা অসৎ সঙ্গে মিশে বখে গিয়েছিলো। একসময় ডাকাতদলে নাম লিখিয়েছে। আর বোনটা অবর্ননীয় দুঃখ কষ্ট সহ্য করে বড় হয়েছে। গরীব ঘরে রূপসী মেয়ে জন্ম নিলে শেয়াল কুকুরে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। ডাকাতের বোন বলে কোন ভালো ঘরে তার বিয়েও হয়নি। অথবা হয়তো অনেক অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সংসার টেকেনি। পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে শেষে মেয়েটিও তার ভাইয়ের মতো অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। কিন্তু এই জীবনের সাথে সে এখনও অভ্যস্ত হতে পারেনি। বাইরে যতই কঠিন রূপ দেখাক না কেন, ভেতরটা তার কোমল, ফুপের পাপড়ির মতো।

আমি অস্ফুট কণ্ঠে বললাম, “মরতে যদি হয়, আমি তোমার হাতে মরতে চাই। প্লিজ গুলিটা তুমি করবে?”

মেয়েটি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে। নীরবে অস্রু বিসর্জন দিচ্ছে।

জলিল ডাকাত হেসে বলল, “হ হ! আমার বইন ই তোরে গুলি করবো”।

***

গাড়ি থামালো রুবেল। অর্থাৎ আমাকে মেরে ফেলে রাখার মতো সুন্দর একটা যায়গা মিলে গেছে। গাড়ি থেকে টেনে নামালো। রাস্তার পাশে ঘন ঝোপ-ঝাড়। আমাকে তারা একটা গাছে নিচে নিয়ে দাঁড় করালো। হাত পা বাঁধেনি। আমি চাইলে এক ছুটে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যেতে পারি। ঘন গাছ পালার মধ্যে গায়ে গুলি লাগার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু আমি তা করবো না। আমার তো পালানোর কোন ইচ্ছে নেই!

জলিল তার বোনের হাতে একটা পিস্তল ধরিয়ে দিলো। “নে বোন গুলি কর”।

মৌরী কাঁপা কাঁপা হাতে পিস্তলটা নিলো।

আমি মৌরীর চোখে চোখ রেখে হাসলাম। বললাম, “বুকের বাম দিকে করো”।

মৌরী কান্না জড়ানো সুরে তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি পারুম না!”

জলিল এক মুহুর্ত চুপ করে থাকল। তারপর শীতল গলায় বলল, “আমার অনেক দিন ধইরা মনে হইতাছিল দলের ভিতর একটা বেঈমান আছে। পুলিশের কাছে সব খবর দিয়া দিতেছে! এর লেইগাই তো বিভিন্ন যায়গায় আমাগো বহুত লোক ধরা খাইছে। এখন মনে হইতাছে তুই সেই বেঈমান!”

“না ভাই!” আঁতকে উঠলো মৌরী। “আমি এমন কিছু করি নাই ভাই! বিশ্বাস কর! আমি বেঈমানি করি নাই তোমার সাথে”।

“তাইলে প্রমান দে!” জলিলের চোখে ক্রোধের আগুন। “গুলি কর এই পোলারে!”

“একটা নিরীহ পোলারে মারলে কি প্রমান হয় ভাই?”

“প্রমান হয় তুই ডাকাত! ডাকাতের মধ্যে মায়া দয়া কিছু নাই”।

মেয়েটির চোখের পানি বাঁধ মানছে না। তারই মধ্যে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পিস্তল হাতে নিলো সে। তাক করলো আমার বুকের ওপর। গুলি করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। আমিও মনে মনে প্রমাদ গুনছি! তবে কি আর কয়েক সেকেন্ড পরেই এই দস্যুকন্যার হাতে আমার মৃত্যু হবে?

হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো মৌরী। ভাইয়ের বুকে পিস্তল ধরলো। দৃঢ় কণ্ঠে বললো, “ভাইজান, ওরে যাইতে দেও”।

“আমার ধারণাই তাইলে ঠিক ছিলো!” জলিলের ঠোঁটের কোনে ভুবন জয়ের হাসি দেখা দিলো। “তুই সেই বেঈমান, যে আমাগো সব খবর পুলিশে জানায় দিতাছিল। এত বড় দলের সবাই পুলিশের জিম্মায়। তুই আমাগোরে ধ্বংস কইরা দিতাসোস! আর পারবি না!”
বলে জলিল এক পা সামনে এগিয়ে এলো।

“ভাই, সামনে আগাইয়ো না! আমি কিন্তু গুলি করুম”।

“কর গুলি!” বলে হাসতে হাসতে আরও দু কদম এগিয়ে এলো জলিল।

মৌরীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। “ভাই, আল্লাহর দোহাই লাগে আর সামনে আইসো না! আমি কিন্তু গুলি করতে জানি!”

জলিল শুনছে না। সে সামনে এগিয়ে আসছে। তাই দেখে মৌরী ব্যস্ত গলায় আমার উদ্দেশ্যে বললো, “ঐ পোলা! খাড়াইয়া খাড়াইয়া তামাশা দেইখো না! ভাগো জলদি!”

বলা বাহুল্য- আমি মৌরীর কথা শুনবো না!

জলিল একেবারে কাছে চলে এসেছে তার বোনের। মুখে মুচকি হাসিটাও ধরে রেখেছে। মৌরী সেফটি ক্যাচ অফ করে নিলো পিস্তলের। তারপর ঝট করে পিস্তল নামিয়ে জলিলের পায়ে তাক করলো। গুলি করে দিলো…
নাহ! কোন বুলেট বের হয়নি! ফাঁকা আওয়াজ করল পিস্তল!

জলির এবার উন্মাদের মতো হাসতে শুরু করলো। হাসতে হাসতেই বললো, “কি ভাবছিলি? তোর হাতে গুলি ভরা পিস্তল দিছি? বেঈমানের হাতে গুলি ভরা পিস্তল দেওয়ার মতো বোকা আমি না! হা হা হা!”

মেয়েটি অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে হাতের পিস্তলের দিকে। চোখ বেয়ে উপচে পড়ছে অশ্রু।

“আমার কাছে বেঈমানের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড! এইবার তোরে উপরে পাঠায় দিমু, আমাগো বাপ মার কাছে”। বলে জলিল পিস্তল ধরলো তার বোনের কপালে।

“ভাইজান, আমি বেইমানি করি নাই। বিশ্বাস করো!” মেয়েটি অঝোরে কাঁদছে। খুব অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। আমার বুকের ভেতরটাও কেমন যেন টন টন করছে তার কান্না দেখে!

অকস্মাৎ একটা কান্ড ঘটে গেলো। চোখের পলকে নড়ে উঠলো মনসুর ডাকাত। জলিলের মাথার পেছনে আঘাত করলো পিস্তলের বাট দিয়ে। জলিলকে দেখে মনে হলো শক খেয়েছে! উপুড় হয়ে আছড়ে পড়লো মাটিতে। ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালো রুবেল ডাকাত। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তলপেটে মনসুরের লাথি খেলো সে। ঘোঁত করে একটা শব্দ বের হলো মুখ থেকে, সামনের দিকে নুয়ে পড়লো রুবেল। সেই অবস্থায় তার মাথায় পিস্তল দিয়ে আঘাত করলো মনসুর। জলিলের পাশেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলো রুবেল।

ঘটনাটা যেন চোখের পলকে ঘটে গেলো! আমি আর মৌরী হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি, এক চুলও নড়িনি। মনসুর এগিয়ে গেলো মৌরীর দিকে। মেয়েটির মাথায় একটা হাত রেখে বললো, “তোর ভাই যে বেঈমান খুঁজতাছে, সেইটা আমি। আমি পুলিশের লোক। গোপনে ডাকাইত দলে ঢুইকা গডফাদার শমসের এর সব ব্যবসা বন্ধ কইরা তারে হাতে নাতে ধরার প্ল্যান ছিল আমার। খুব কাছাকাছি চইল্লা আসছিলাম। কিন্তু মনে হয় আর পারলাম না…”

মনসুর মেয়েটির হাত ধরে টেনে আমার সামনে নিয়ে এলো। আমার একটা হাত ধরে মৌরীর হাতটা তুলে দিলো। বললো, “এই ছেলে! তুমি না বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজছিলে? এই নাও তোমাকে অবলম্বন দিলাম। এই হাত কখনও ছাড়বে না!”
আমি হ্যা-বোধক মাথা ঝাঁকালাম।

দূরে কোথাও পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেলো। মনসুর দ্রুত হাতে টাকার ব্যাগ থেকে টাকার একটা বান্ডেল বের করে ধরিয়ে দিলো আমার হাতে। “ওকে নিয়ে অনেক দূরে পালিয়ে যাও। তোমাদের চেনা জানা কারো সাথে কোন রকম যোগাযোগ রাখবে না! নতুন করে জীবন শুরু করো। যাও!”

মৌরী দৌড় দিল আমার হাত ধরে। আমিও পা চালালাম তার সাথে। ঘন ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে দৌড়ে পার হয়ে এলাম যায়গাটা। বেশ খানিকক্ষণ এগোনোর পর থামলাম দুজনে। সামনে একটা জলাশয় দেখা যাচ্ছে। একটা গাছের নিচে দাঁড়ালাম দুজনে। হাঁপাচ্ছি খুব।

মৌরী আমাকে জড়িয়ে ধরলো। মাথা রাখল বুকে। আমার একটা হাত পেছনে। কোমরের ভাজে একটা পিস্তল লুকানো আছে। শার্ট উচু করে পিস্তলটা বের করে আনলাম। মৌরী সেটা টের পায়নি। কাঁদছে অঝোর ধারায়।

জলিল ডাকাতের সন্দেহ হয় তার দলে একজন বেঈমান আছে। সে তার বোনকে সন্দেহ করতো। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছিলো না। তাই সে গডফাদার শমসেরকে ব্যাপারটা জানায়। শমসের আমাকে ভাড়া করে দলের এই কালপ্রিটটাকে খুঁজে বের করার জন্য। আমি মোটেও বড়লোকের বখে যাওয়া সন্তান নই। আমি একজন মার্সেনারি। একসময় আর্মিতে ছিলাম। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আমাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তারপর থেকে ভাড়াটে গুন্ডা হিসেবে কাজ করি।

প্ল্যানটা ছিল খুব সিম্পল! আমার দায়িত্ব ছিলো একটা নাটক করে দলের মধ্যে ঢুকে পড়া। তারপর মৌরীকে আমার গায়ে গুলি করতে বাধ্য করা। যদি গুলি করে তাহলে ধরে নেবো সে বেঈমান না। কিন্তু ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেবে তা ভাবতেও পারিনি! আসলে মৌরীকে প্রথমবার দেখার পর থেকেই সবকিছু কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে গেলো…

হাতে ধরা পিস্তলটা আলগোছে ছুড়ে ফেললাম ডোবার জলে। দস্যুকন্যা আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম। চুলে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিলাম। জীবনটাকে সত্যিই আজ প্রথমবারের মতো অর্থবহ মনে হচ্ছে!

(সমাপ্ত)

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি