বড় গল্প

ভিলেন – নাজিম উদ দৌলা

মৌরীর জন্মদিনে কী গিফট দেওয়া যায় তাই ভাবছি। শুধু গিফট না, ভালো একটা সারপ্রাইজও দেওয়া দরকার। ক্রিয়েটিভ সেক্টরের মানুষেরা বউয়ের জন্মদিনকে স্পেশাল করার জন্য নানান আইডিয়া বের করে। আমার কাছেও কেউ আইডিয়া চাইলে ফ্রি-তে ১০০টা আইডিয়া দিয়ে দেই। অথচ নিজের বেলায় ভাবতে গিয়ে কিছুই মাথায় আসছে না!

মৌরীর অবশ্য খুব বেশি চাহিদা নেই। অল্পতেই সে খুশি হয়ে যায়। যা দেখে তাতেই সারপ্রাইজড হয়। কোথাও হয়তো যাচ্ছি, একজন মহিলার কোলে ফুটফুটে একটা শিশু দেখেই সে “ওয়াও! কি কিউট বাচ্চা!” বলে চেচিয়ে ওঠে। আবার রাস্তার নেড়ি কুকুরের বাচ্চা দেখেও বলে ওঠে- “আউ! কি সুন্দর কুকুরছানা!” দিনের বেলা আকাশে মেঘের দল দেখে যেমন অবাক হয়, তেমনি রাতের আকাশে তারার দিকেও অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে!

হঠাৎ মনে পড়লো মৌরী কিছুদিন আগে একটা স্মার্টওয়াচ কিনতে আগ্রহ দেখিয়েছিলো। হাতঘড়ির প্রতি অনেক আগে থেকেই মৌরীর একটা ফ্যাসিনেশন কাজ করে। কেউ ঘড়ি গিফট করলে সে যার পর নাই খুশি হয়। তাই ডিসিশন নিলাম সুন্দর দেখে একটা স্মার্টওয়াচ কিনে দেবো তাকে। কিন্তু মেয়েদের হাতে পড়ার জন্য কি ধরণের স্মার্টওয়াচ ভালো হবে বুঝতে পারছি না!

অফিসে একদিন কি একটা বিষয় নিয়ে যেন আরাবীর সাথে কথা বলছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো আরাবীর হাতে একটা সুন্দর স্মার্টওয়াচ। কালো ওয়াচের দুইপাশে নীল রঙের স্ট্র্যাপ। আরাবী হচ্ছে আমার অফিসের ক্লায়েন্ট সার্ভিস ম্যানেজার। খুব স্মার্ট, রুচিশীল, সারাক্ষণ ঠোঁটে হাসি লেগে থাকে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম- “এই স্মার্টওয়াচটা কোত্থেকে কিনেছো আরাবী?”

আরাবী হেসে উত্তর দিলো, “কেন? ভাবীর জন্য কিনবে নাকি?”

আমি লাজুক ভঙ্গীতে হাসলাম।

“ও মা! ছেলে দেখি লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে!”

খানিক্ষণ মজা করলো আরাবী। তারপর আমাকে বসুন্ধরা সিটির একটা দোকানের ঠিকানা দিয়ে দিলো।

আমি দোকানে এসে ঐ স্মার্টওয়াচটা চাইলাম। ওরা এনে দিলো। আমার চেহারায় হাসি ফুটে উঠে আবার নিভে গেলো। আরাবীর হাতে যে ঘড়িটা দেখেছিলাম সেটায় নীল রঙের স্ট্র্যাপ ছিলো। কিন্তু এই ঘড়িটায় কালো স্ট্র্যাপ।

“ভাই, নীল রঙের মডেলটা নেই?”

“আমাদের কাছে নেই”। দোকানদান জানালো।

আমার আফসোস হতে থাকলো। নীল রঙের মডেলটা মৌরীর হাতে বেশি মানাতো! কি করা যায়? পুরো মার্কেট ঘুরলাম আমি নীল মডেলটার আশায়। কিন্তু কারো কাছেই নেই। শেষে আবার প্রথম দোকানে ফেরত এলাম।

“ভাই, আপনারা কি নীল মডেলটা আনিয়ে রাখতে পারবেন?”

দোকানদার বললো, “এডভান্সড করে যান। আমরা এনে রাখবো”।

অ্যাডভান্সড করে এলাম। দুই দিন বাদে দোকানদার ফোন দিয়ে জানালো যে নীল রঙের স্ট্র্যাপের মডেলটা পাওয়া গেছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম! যাক, গিফট হয়ে গেছে! এবার সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য কি করা যায়?

অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ট্র্যাডিশনাল ওয়েতে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিলাম। আমাদের বন্ধু-বান্ধব যা আছে সবাইকে গোপনে দাওয়াত করলাম জন্মদিনে আসার জন্য। মৌরীকে আগে থেকে কিছু জানতেই দিলাম না। তারপর ছোট ভাই তপুর সাহায্যে বাসায় ছোটোখাটো একটা পার্টির আয়োজন করলাম।

***

জন্মদিনের সকাল থেকেই খুব বোরিং সময় কাটছিলো মৌরীর। আমি অফিসের কাজ নিয়ে বিজি থাকার ভান করছিলাম আর সে একা একা ফেসবুকে নিউজফিড চেক করছিলো মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে।

হঠাৎ বিকেলে কলিং বেলের আওয়াজ। মৌরী দরজা খুলে দেখে তার বান্ধবী টিসা, তমা ও অন্যান্যরা সবাই এসেছে। মৌরীতো ভীষণ রকমের সারপ্রাইজড! একে একে মৌরীর অন্যান্য বান্ধবীরাও সবাই আসতে থাকলো। ওর আনন্দ তখন দেখে কে? আনন্দের তার চোখে পানি চলে এলো!

কেক কাটা, গান-বাজনা, হই-হুল্লোড়ে দারুণ কাটলো সময়। রাতে ডিনারের পর ফ্রেন্ডরা সবাই একে একে বিদায় নিলো। তারপর আমরা দুইজনে বসলাম গিফট বক্সগুলো নিয়ে। আমার কেনা গিফটটা এখনও মৌরীকে দেইনি। সবার শেষে দেবো বলে গিফট বক্সটা পেছনের হাতে লুকিয়ে রেখেছি। মৌরী একটা একটা করে গিফট বক্স খুলছে আর খুশিতে তার চোখদুটো ঝিলিক মারছে! সব শেষে একটা বক্স দেখে মৌরী চমকে গেলো। বক্সের উপর সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা- “মৌরীর জন্য একটি গোলাপ”

মৌরীর হাত কাঁপছে। তাই দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি হলো?”

“এই বক্সটা না খুলি?”

“কেন?” আমি তো অবাক!

মৌরী আর কিছু বলছে না।

“কি হলো? বক্সটা খুললে প্রবলেম কি? তোমার বন্ধুরাই তো দিয়েছে!”

মৌরী বললো, “না, এটা বন্ধুরা কেউ দেয়নি। সম্ভবত বন্ধুদের কারো হাতে বক্সটা দিয়ে দিয়েছে আরেকজন”।

“আরেকজন? কার কথা বলছো?”

“অর্ক!”

নামটা শুনে আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলাম।

“অর্ক আমাকে জীবনে প্রথম যে গিফট দিয়েছিলো, তার বক্সের উপরে এমন একটা চিরকূটে লেখা ছিলো- মৌরীর জন্য একটি গোলাপ”।

আমি নিজেকে সামলে নিলাম। হেসে ব্যাপারটা উড়িয়ে দেওয়ার জন্য বললাম- “সেই গিফট বক্সের ভেতর নিশ্চয়ই একটা দুই দিনের পচা গোলাপ ছিলো?”

মৌরী মাথা নাড়লো, “না, একটা হাতঘড়ি।”

মৌরী বক্সটা খুললো। ভেতর থেকে যা বের হলো তা দেখে আমি ভয়ংকরভাবে চমকে গেলাম। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো। কোনমতে টেবিলের কিনার ধরে তাল সামলালাম। বক্সের ভেতর থেকে বের হলো একটা স্মার্টওয়াচ। আমি যে স্মার্টওয়াচ কিনে এনেছি মৌরীর জন্য, ঠিক সেটাই!

মৌরী ঘড়িটা বক্স থেকে বের করে হাতে নিলো। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো। ঘটিটা যে তার যে খুব পছন্দ হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না! আমার কেনা ঘড়ির মতো একই ঘড়ি এটা, কিন্তু মডেলটা ভিন্ন। আমি মৌরীর জন্য অনেক খুঁজে নীল রঙের স্ট্র্যাপওয়ালা ঘড়িটা কিনে এনেছি। আর অর্ক ঐ নরমাল কালো মডেলটাই কিনে পাঠিয়েছে।

মৌরী ঘড়িটা নেড়ে চেড়ে বললো, “কি আশ্চর্য দেখো! কালো রঙ যে আমার খুব পছন্দ সেটা অর্ক এখনও মনে রেখেছে!”

আমি তিক্ত ভঙ্গীতে একটু হাসলাম।

পেছনের হাতে ধরে রাখা গিফট বক্সটা আস্তে করে পকেটে রেখে দিলাম।

***

আজ অফিসে কাজের খুব চাপ। দম ফেলার সময়ই পাচ্ছি না। তার উপর একটা সফট ড্রিংকস কোম্পানির বিজ্ঞাপনের আইডিয়া দেওয়ার ডেডলাইন। খুব ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে সময়।

এই সময় অফিস সহকারী আলামিন এসে বললো, “ভাইয়া, আপনারে একটা লোক খুঁজতাছে”।

“কই?”

“নিচতলায়, রিসিপশনে বসাইছি”।

আমি নেমে এলাম নিচে। কিন্তু রিসিপশনের সামনে এসে যা দেখলাম তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না! লোকটা আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালো, হাসছে দাঁত কেলিয়ে। মৌরীর সন্দেহ ঠিক ছিলো- অর্ক ফিরে এসেছে!

আমি হেঁটে এগিয়ে এলাম অর্কর কাছে। অর্ক হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো। আমার মধ্যে হাত মেলানোর কোন লক্ষণ নেই। অর্কর কাছ থেকে একটু দূরত্ব রেখে বসলাম।

“কেন এসেছ?”

অর্ক হাত ফিরিয়ে নিলো, টিটকারির ভঙ্গীতে বললো, “আসলাম আপনার সাথে একটু বাত চিত করার জন্য”।

“বাত চিত করার মতো সময় আমার হাতে নেই”। আমি শীতল কণ্ঠে বললাম। “দরকারি কিছু বলার থাকলে জলদি বলো”।

অর্ক মুখে হাসিটা ধরে রেখে বললো, “একটা আবদার আছে আপনার কাছে”।

“কী?”

“মৌরীকে ডিভোর্স দিয়ে দ্যান”।

কথাটা শোনার সাথে সাথে যেন আমার রক্তে আগুন ধরে গেলো! “হোয়াট? ফাইজলামি করো তুমি আমার সাথে?”

অর্ক’র মুখ থেকে হাসিটা মুছে গেলো। চোয়াল শক্ত করে বললো, “মোটেও ফাজলামি না। আই এম ড্যাম সিরিয়াস! আপনার ডিভোর্স দিতে হবে মৌরীকে। কারণ মৌরী আমার! শুধু আমার!”

নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না আমার! এমন স্পর্ধা এই ছেলে পেলো কই? আমার অফিসে বসে আমাকে বলছে- আমার বউকে… স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললাম, “যদি না দেই?”

“তাহলে মৌরীই আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে!”

এবার আমি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলাম। “এতো কনফিডেন্স?”

অর্ক বোঝানোর ভঙ্গিতে বলতে থাকলো, “দেখেন ভাই, মৌরী কখনোই আপনার ছিলো না। সে আমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। কিন্তু সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝি বিরাট আকার ধারণ করলো। তারপর আমি আমেরিকায় চলে গিয়ে মৌরীর সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। আর সেই সুযোগটাই আপনি নিয়েছেন। এখন আমি আবার ফিরে এসেছি। দুজনেই বুঝতে পেরেছি একটা মিসআন্ডার্স্ট্যান্ডিং এর কারণে আমাদের মধ্যে ঝামেলাটা হয়েছিলো। এখন আর সেটা নেই। আমরা উভয়ই আবার পরস্পরকে কাছে পেতে চাই। অতএব…

“মৌরীর সাথে তোমার কী ছিলো জানি না। কিন্তু এখন মৌরীর মনের সবটুকু জুড়ে কেবল আমিই আছি! আমাদের দুজনের মাঝে এসে দাঁড়ানোর কথা স্বপ্নেও ভেবো না। আদারওয়াইজ, তোমার কপালে খারাপি আছে!” বলে আমি উঠে দাঁড়ালাম।

অর্কও উঠে দাঁড়ালো। গরম চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

আমি তার চোখে চোখ স্বাভাবিক কণ্ঠে বললাম, “এখন যাও। দ্বিতীয়বার আমার অফিসের আসার চিন্তাও করো না!”

অর্ক খানিকটা কাছে এগিয়ে এলো। দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “মনে রাখবেন নাজিম সাহেব! আমাদের তিনজনের এই গল্পে আমিই নায়ক, আর আপনি হচ্ছেন ভিলেন! আর ভিলেনরা কখনো নায়িকাকে পায় না!”

অর্ক গট গট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো। যতই তার সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি না কেন, আসলে ভেতর ভেতর ঘাবড়ে গিয়েছি আমি। দুশ্চিন্তার ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেছে মাথায়!

***

অনেকক্ষণ ধরে একটা বই পড়ার চেষ্টা করছি। হারলান কোবেন-এর “ডোন্ট লেট গো”। কোবেন আমার প্রিয় লেখক, খুব স্বাভাবিক জীবনের গল্পগুলোর ভেতরেই থ্রিল খুঁজে বেড়ান তিনি। আর এই বইটাও বেশ ভালো হয়েছে বলে শুনছি। কিন্তু আমি কেন যেন মনোযোগ দিতে পারছি না।

অবশ্য বইটা কিন্ডল ইবুক রিডারে পড়ছি বলেই হয়তো এমন লাগছে। গত জন্মদিনে মৌরী আমাকে এটা উপহার দিয়েছিলো। তারপর থেকে সব সময় সঙ্গেই রাখি। কিন্তু কাগজের বই পড়ার মজা কি আর কিন্ডলে জোটে?

সমস্যাটা কিন্ডলে, নাকি আমার মনে- সেটাই বা নিশ্চিত হই কি করে?

রাত বাজে সাড়ে দশটা। মৌরী এখনও বাসায় ফেরেনি! অফিসের কি যেন কাজ আছে বললো। নয়টা পর্যন্ত মোবাইল অন ছিলো। এখন মোবাইলও অফ পাচ্ছি। হয়তো চার্জ চলে গেছে। কিন্তু আমার মনের আশংকা কাটছে না।

আবোল-তাবোল ভাবতে ভাবতেই কলিং বেল বাজার আওয়াজ। দরজা খুলে দিতেই মৌরী ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো।

“কখন এসেছ তুমি? ইস! অনেক দেরি করে ফেললাম, তাই না? সরি গো!”

“নয়টার দিকে বললে আর ৫ মিনিট লাগবে?”

“আসলে কি জানো? তোমার জন্য একটা স্পেশাল রান্না করবো বলে একটু স্বপ্নতে নেমেছিলাম কয়েকটা ইনগ্রিডিয়েন্ট কিনতে। আমার স্কুলের বান্ধবী আছে না, শারমিন? ওর সাথে দেখা হয়ে গেলো। এক কথায়- দুই কথায়… তুমি রাগ করো না, প্লিজ! চা খাবে? চা করে দেই?”

আমি মৌরীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। মিথ্যে কীভাবে বলতে হয়, সেটাও মৌরীর জানা নেই! ওর চোখ দুটো স্পষ্ট বলে দিচ্ছে- সামথিং ইজ নট রাইট!

অন্যদিকে তাকালাম। বললাম, “না, এখন আর চা খাবো না। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি শুয়ে থাকি, মাথাটা ধরেছে”।

আমি বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।

***

মৌরী যে অর্ক-এর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বা দেখা-সাক্ষাৎ করছে, সেটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। মৌরীর চোখ, প্রত্যেকটা আচরণ বলে দিচ্ছে- তার নিজের ভেতর একটা গিলটি ফিলিংস কাজ করছে। তবে মৌরীর প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। বিশ্বাস ছাড়া তো ভালোবাসা হয় না! আমি জানি সে বিষয়টার ইতি টানবে। ঘুরি আর কদ্দুর যাবে, নাটাই তো আমার হাতে! তবে মাঝে মাঝে ভয় হয়- ভোকাট্টা হয়ে যাবে না তো?

ভয়টা দূর করার জন্য কি করা যায়? এই ক্ষেত্রে একজন হাজব্যান্ডের সামনে দুটো পথ খোলা থাকে। এক- রুড হওয়া। বউয়ের চলা-ফেরায় রেস্ট্রিকশন দিতে হবে; কি করছে, না করছে সারাক্ষণ নজরে রাখতে হবে। দুই- সহজ হওয়া। যেমন খুশি চলতে দিতে হবে। তবে প্রচন্ড ভালোবাসতে হবে। ভালোবাসার বাঁধনে আগলে রাখতে হবে। যেন এই বাঁধন ছিড়ে যাওয়ার কথা ভুলেও ভাবতে না পারে!

আমি দ্বিতীয় পন্থাটাই অবলম্বন করার চেষ্টা করলাম। কারণ প্রথমটা মৌরীর ক্ষেত্রে কাজে না লাগার সম্ভাবনাই বেশি। বাড়ির সবার ছোট ছিলো সে, আদরে বড় হয়েছে। তাই জেদটাও একটু বেশি। রেসট্রিকশন দিতে গেলে হয়তো হিতে-বিপরীত হয়ে যাবে। তাছাড়া, আমি জোর করে ভালোবাসা আদায় করতে চাই না! ভালোবাসা কিনতে চাই ভালোবাসার দামে! তাই মৌরীকে ভালোবাসায় বেঁধে রাখার যুদ্ধে নামলাম এবার।

মৌরীকে পাগলের মতো ভালোবাসতে শুরু করলাম। প্রতিটি মুহূর্তে ভালোবাসছি। সকালে তার কপালে চুমু খেয়ে অফিসে যাচ্ছি, সারাদিন ফোন করে বা মেসেজ দিয়ে খবর নিচ্ছি, সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় তার পছন্দের খাবার নিয়ে আসছি, রাতে বাসার ছাদে বসে আকাশের তারা গুনছি। উইকএন্ডে মৌরীর পছন্দের যায়গাগুলোতে যাচ্ছি, হাত ধরে ঘুরছি, নদী কিংবা লেকের পাড়ে বসে স্বরচিত রোমান্টিক কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি… মোট কথা ভালোবাসা ধরে রাখার যত উপায় আমার জানা আছে সবই তার উপর প্রয়োগ করছি।

কিন্তু কিছুতেই লাভ হচ্ছে না! যতই দিন যাচ্ছে, মনে হচ্ছে মৌরী আমার কাছ থেকে একটু একটু দূরে সরে যাচ্ছে… কেন হচ্ছে এমন? তিল তিল করে সাজালাম যে সংসার তা পুরনো এক ঝড় ফিরে এসে এক নিমেষে লন্ড ভন্ড করে দেবে? এতই শক্তি সেই ঝড়ের?

***

আজ মৌরী চলে যাবে। চিরদিনের মতো একলা ফেলে যাবে আমায়। গতরাতেই ছোট একটা ব্যাগের ভেতর কিছু কাপড়-চোপড় আর প্রয়োজনীয় সব জিনিস গুছিয়ে নিয়েছে সে। আমাকে বলেছে চিটাগং-এ এক বান্ধবীর বিয়ে খেতে যাচ্ছে, দুদিন থাকবে। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে মৌরী আসলে চট্টগ্রামে যাচ্ছে না। কারণ গতরাতে মৌরীর হ্যান্ডব্যাক চেক করে দুইটা টিকেট পেয়েছি আমি। ট্রেনের টিকেট, ঢাকা-টু-সিলেট।

সিলেটে অর্ক’র গ্রামের বাড়ি। আমি নিশ্চিত এখান থেকে বের হয়ে মৌরী প্রথমে তার সাথেই দেখা করবে। তারপর শুরু হবে তার নিরুদ্দেশযাত্রা। হয়তো সিমটা ভেঙ্গে ফেলবে, ডিএকটিভ করে দেবে ফেসবুক আইডি, এতদিনের পুরনো ইমেইল আইডিটা আর ব্যবহার করবে না…

এই মুহূর্তে মৌরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা টাচআপ নিচ্ছে। মেয়েটি কখনো ভারি মেকআপ করে না। তার ভালো লাগে না। অল্প একটু সাঁজ, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক, কপালে টিপ… ব্যাস! কী যে স্নিগ্ধ আর মায়াময় লাগে চেহারাটা! ইচ্ছে করে দুহাতে ধরে সারাদিন চেয়ে থাকি!

“কী দেখছ?” আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো মৌরী।

“কিছু না, এমনিই”।

“এমনভাবে দেখছো, মনে হচ্ছে আগে কখনো দেখোনি?”

আমি মাথা নাড়লাম। “না তা না! আসলে মনে হচ্ছে আর কখনো দেখতে পাবো না!”

আমার কথাটা শুনে ঘাবড়ে গেলো মৌরী। তাকিয়ে থাকলো অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে।

আমি পরিস্থিতি সহজ করতে একটু হাসলাম। “চা খাবে? চা করে আনি?”

“ন… নাহ, দেরি হয়ে যাবে”।

“দেরি কিসের? বাস তো সাড়ে এগারোটায়”।

“না… আসলে আগে আরেক বান্ধবীর বাসায় যাবো, তারপর সেখান থেকে সবাই মিলে…”

“আরে রাখো তো! চা করতে আর এমন কি টাইম লাগবে? পানি গরম করবো, তারপর দুধ চিনি মিশিয়ে টি-ব্যাগ লাগিয়ে দেবো…”

বলে আমি কিচেনে চলে এলাম। কেতলিতে পানি নিয়ে চুলায় বসালাম।

কেমন যেন একটা কষ্টের অনুভূতি হচ্ছে আমার। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে হৃদপিন্ডটা কেউ একজন খামচে ধরে বের করে নিচ্ছে! নিঃশ্বাস ফেলতেও কষ্ট হচ্ছে! মৌরী চলে যাচ্ছে… আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে… এটা আমি কী করে মেনে নেই? আমার কী ওকে আটকানো উচিত না? কিন্তু সে যদি নিজ থেকেই চলে যেতে চায়, তাহলে আমার আর কী করার আছে?

হঠাৎ একটা বিষয় মাথায় খেলে গেলো। ভালোবেসে তো লাভ হয়নি। দায়িত্বের বাঁধনে যদি আটকে দেই মৌরীকে, তাহলে কেমন হয়? কারো প্রতি দায়িত্ব পালনের ইচ্ছেটুকুও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ!

আমি বড় করে একটা দম নিলাম। সাহস সঞ্চয় করলাম। তারপর ডান হাত বাড়িয়ে ধরলাম চুলোর ভেতর। প্রায় সাথে সাথে চামড়া পোড়ার গন্ধ এসে আমার নাকে ধাক্কা মারলো! সমস্ত শরীরে ব্যথার অনুভূতি যেন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে… আমার হাত পুড়ছে… আমি আর সহ্য করতে পারলাম না… প্রচন্ড জোরে বাড়ির দেয়ালগুলো কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম…

***

এক মাস পর…

জীবনে সুখের অনুভূতি ফিরে এসেছে আবার! ডান হাতের অবস্থা অবশ্য খারাপ, কিন্তু আমি খুবই ভালো আছি। হাসছি, খাচ্ছি, ঘুরছি, মুভি দেখছি, ঘুমাচ্ছি… মৌরী আছে আমার সাথে সব সময়। যতক্ষন বাসায় থাকি, এক মুহূর্ত আমাকে আর কাছ ছাড়া করে না সে। বলা তো যায় না- আবার যদি কোন বিপদ বাঁধিয়ে ফেলি?

সেদিন আমার হাত পুড়ে যাওয়ার পর মৌরীর অবস্থা হয়েছিলো দেখার মতো। আমার হাত ধরবে, কাউকে ফোন দেবে, না হাসপাতালে নিয়ে যাবে… পাগল হওয়া বাকি ছিলো আর কী! আমার চেয়ে বেশি চিৎকার, কান্নাকাটি সে-ই করেছে! মৌরীর চোখের পানি টপ টপ করে আমার হাতের উপর পড়ছিলো। এক নিমেষে আমার ব্যথা-যন্ত্রনা সব উধাও! এই অশ্রু ভালোবাসার অশ্রু! আমার ধারণাই ঠিক! আমার জন্য একবুক ভালোবাসা জমিয়ে রেখেছে মেয়েটা! কোন কারনে সেটা সুপ্ত অবস্থায় ছিলো, কিন্তু ঐদিন সময় মতো বেরিয়ে এসেছিলো।

তারপর থেকে আমরা আবার এক হয়ে মিশে গেছি পরস্পরের সাথে। ইতিমধ্যে বুঝে গিয়েছি- মৌরী আর অর্ক’র সাথে যোগাযোগ রাখছে না। অর্থাৎ কোনো ঝড় আর আমাদের আলাদা করতে পারবে না! কিন্তু কথা হচ্ছে- অর্ক কি এতো সহজে মেনে নেবে? সে তো তার প্ল্যানে প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিলো- শেষ মুহূর্তে আমার একটা আনপ্রেডিক্টেবল চালে সে ধরা খেয়ে গেছে। অর্ক নিশ্চয়ই একটা শেষ চাল দেবে, তাই আগে থেকে আমাকেও একটা চাল ভেবে রাখতে হবে!

এরপর একদিন…

অফিস থেকে বের হয়েছি কেবল, সাথে সাথে একটা মাইক্রোবাস এসে থামলো আমার সামনে। মুখোশ পরা কয়েকজন ধুপ ধাপ নামলো। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমাকে দুইপাশ থেকে চেপে ধরলো। একজন পেছন থেকে রুমাল ধরলো আমার নাকে-মুখে। সাথে সাথে আমার চোখের সামনে পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে এলো…

***

একটা হাত আমার মুখের ওপর থেকে কালো কাপড়টা একটানে খুলে নিলো। প্রথমে তাকাতে কষ্ট হলো আমার। বারকয়েক চোখ পিট পিট করতেই দৃষ্টি পরিষ্কার হয়ে এলো। প্রায় অন্ধকার রুম। চেহারের সাথে হাত পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে আমাকে।

আবছা অন্ধকারে মনে হচ্ছে কেউ একজন বসে আছে আমার সামনে। অন্ধকার একটু সয়ে আসতেই দেখলাম সামনে বসে থাকা লোকটি অর্ক! তার পাশের চেয়ারে বসে আছে আরেকজন। এই লোকটাকে আমি চিনি না। হতে পারে অর্ক-এর কাছের কেউ।

অর্ক পাশের লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। লোকটা নিজের পকেট থেকে মোবাইল বের করে অর্ক-এর হাতে ধরিয়ে দিলো।

অর্ক আমার চোখে চোখ রেখে নিজের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করলো। তারপর আমার চোখ থেকে চোখ না সরিয়েই ফোন করলো কোন একটা নম্বরে। আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সে মৌরীকে ফোন করেছে। মোবাইল লাউড স্পিকারে দিলো অর্ক। রিং হচ্ছে…

ওপাশ থেকে মৌরী রিসিভ করলো, “হ্যালো…”

অর্ক তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে হেসে বললো, “মৌরী ম্যাডাম! কেমন আছেন?”

মৌরী বললো, “অর্ক! তোমাকে না আমার কাছে ফোন করতে নিষেধ করেছি?”

“নিষেধ করলেই কি আর শোনা যায়, বলুন? আমার সঙ্গে আপনি পালিয়ে যাবেন বলে আশা দিয়েও পল্টি মেরেছেন! এত সহজে ছেড়ে দেবো ভেবেছেন?”

“অর্ক! নাজিমের হাত পুড়ে গিয়েছিলো! হাজার হোক, সে আমার হাজব্যান্ড…”

অর্ক বললো, “এই কারণেই আপনার হাজব্যান্ডকে আপনার জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা করেছি আমি! যাতে আমার কাছে আসায় আপনার আর কোন বাধাই না থাকে!”

“মানে? কি বলছো তুমি?”

“তোমার হাজব্যান্ডকে তুলে এনেছি আমি”।

“হোয়াট! কেন?” মৌরী হতবাক।

“তুমি যদি চাও সে জীবিত থাকুক, তাহলে তাকে ডিভোর্স দিতে হবে তোমার!”

“প্লিজ অর্ক! এইরকম কিছু করো না তুমি!” মৌরীর গলার আওয়াজ শুনে মনে হলো কান্না করে দেবে।

অর্ক বলে যাচ্ছে, “তুমি এক্ষুনি একজন ডিভোর্স ল’ইয়ার এর কাছে যাবে। ডিভোর্স লেটার রেডি করবে। যতদিন পর্যন্ত না ডিভোর্স কার্যকর হচ্ছে, তোমার হাজব্যান্ড আমার কব্জায় থাকবে… বুঝতে পেরেছো?”

বলে ফোন কেটে দিলো অর্ক। আমার দিকে তাকিয়ে আছে এক নজরে। মনে হচ্ছে যেন দুই চোখের আগুন দিয়ে আমাকে ভস্ম করে দিতে চায়! আমিও কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। অর্ক তার হাতের  মোবাইলটা ছুড়ে দিলো পাশের লোকটার কোলে। তারপর উঠে দাঁড়ালো, কোন কথা না বলেই বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

অপর লোকটাও পকেটে মোবাইল রেখে উঠে দাঁড়ালো। সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। ওদিকে একটা ভাঙা জানালা দেখা যাচ্ছে। তারই ফাঁক গলে আলো আসছে ভেতরে।

খেয়াল করলাম লোকটা যে চেয়ারে বসে ছিলো তাতে একটা মোবাইল পড়ে আছে। তারমানে লোকটা মোবাইল পকেটে রাখতে গিয়ে চেয়ারে রেখে দিয়েছে! চোখের সামনে একটা সুযোগ দেখতে পাচ্ছি! আমি মাথা নিচু করে মোবাইলের কাছে মুখ নিলাম। দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলাম মোবাইলটা। তারপর ডান হাতে নিলাম। এটা একটা ফিচার ফোন, হ্যাশ বাটনে চাপ দিয়ে ধরে রাখতেই কী-প্যাড লক খুলে গেলো। দ্রুত মেসেজ অপশনে গেলাম আমি। মৌরীর নাম্বারে মেসেজ পাঠাচ্ছি। কিন্তু কি বলবো? কই আছি আমি?

লোকটা খোলা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মাথার উপর দিয়ে আকাশটা দেখা যাচ্ছে। আর দেখা যাচ্ছে একটা বিল্ডিং এর গায়ে লাগানো সাইনবোর্ড- নীরব হোটেল। ওরা আমাকে পুরান ঢাকার নীরব হোটেলের সামনে একটা ঘরে আটকে রেখেছে!

আমি দ্রুত বাংলিশে টাইপ করলাম-

Mowri, ora amake hotel nirob er samner building e atke rekheche.

হঠাৎ করে মনে পড়লো আমার- মৌরীর সাথে প্রথম ডেটে আমরা এই পুরান ঢাকার নীরব হোটেলেই খেতে এসেছিলাম। মৌরীর ভর্তা খুব পছন্দ, তাই প্রথম ডেটটাকে একটু অন্যরকম ভাবে কাটানোর জন্য নানা-রকম ভর্তা ভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম দুজনে! একটা পাগলামি করতে ইচ্ছে হলো খুব! আমি মেসেজটা মুছে দিয়ে নতুন একটা মেসেজ লিখলাম-

Mowri, mone ache prothom date e amra kothai khete esechilam? Ora amake setar samner ek building e atke rekheche.

মেসেজটা মৌরীকে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর দ্রুত সেন্ড ফোল্ডার থেকে মেসেজটা ডিলিট করে দিলাম। কাজটা কি ঠিক করলাম? মৌরীর কী মনে আছে প্রধম ডেটের কথা? সে কি চিনবে যায়গাটা? নাকি চেনার চেষ্টা না করে ডিভোর্স লেটার রেডি করতে যাবে?

ডিভোর্স! তারচেয়ে তো মৃত্যুই ভালো আমার জন্য!

***

কতোটা সময় অন্ধকারে কেটেছে জানি না। হঠাৎ বাইরে লুটোপুটির আওয়াজ পেলাম। চিৎকার চ্যাচামেচি শোনা গেলো কিছুক্ষণ। আচমকা সব ধরণের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেলো। তারপর হঠাৎ ঘরের লোহার দরজায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করার শব্দ হলো। মনে হচ্ছে কেউ লাথি মারছে। কয়েকবার আঘাত করতেই দরজা ভেঙে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করলো কয়েকজন পুলিশ। আর তাদের সাথে এলো- মৌরী!

আমি অনেক কষ্টে হাচড়ে পাঁচড়ে উঠে বসার চেষ্টা করলাম। মৌরী এগিয়ে এলো আমার কাছে। দুই হাতে আমার মুখটা ধরলো সে।

আমি ক্ষীণস্বরে বললাম, “মৌরী? তুমি এসেছ মৌরী?”

“হ্যাঁ নাজিম! আমি এসেছি”।

“তোমার… তোমার মনে আছে তাহলে!”

“কেন থাকবে না? আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন ছিলো ওটা!”

আমার মাথাটা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলো মৌরী। কাঁদছে। কাঁদছি আমিও। দুজনের চোখের অশ্রু যেন আজ আর কোনো বাঁধাই মানবে না!

***

রামপুরা থানার বারান্দায় পা রাখতেই একজন সার্জেন্ট জিজ্ঞেস করলো, “কি চাই?”

আমি বললাম, “এএসপি মামুনের সাথে দেখা করতে আসছি।”

সার্জেন্ট আমার পথ ছেড়ে দিলো। আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম। রামপুরা থানার ডিউটি অফিসার এএসপি মামুন আমার বন্ধু। ভার্সিটি জীবন দুজনে একসাথে পার করেছি।

মামুন আমাকে দেখে বললো, “আরে নাজিম! আয় আয়!”

আমি এগিয়ে এসে চেয়ারে বসলাম।

মামুন বললো, “বদমাইশের বাচ্চাটাকে কইষা পিটাইছি রাতে। হারামযাদার সাহস কতো বড়ো! অপহরনের মামলা করা হইছে। ৫ বছরের জেল নিশ্চিত। ওর সাথের লোকগুলা পালাইছে। ধইরা আনার সব চেষ্টা করতাছি। তুই কোন চিন্তা করিস না!”

আমি বললাম, “আমি একটু কথা বলতে চাই ওর সাথে”।

“আয়” বলে উঠে দাঁড়ালো মামুন।

আমিও উঠে দাঁড়ালাম সাথে। মামুন আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলো প্রিজন সেলগুলোর সামনে। একটা সেলে পড়ে আছে অর্ক।

“দোস্ত, আমি একটু একা কথা বলবো”। আমি বললাম।

“আচ্ছা বল, দুই মিনিট সময় দিলাম তোরে”। বলে সরে গেলো মামুন।

আমি এগিয়ে গেলাম সেলের দিকে।

আমাকে দেখতে পেয়ে ছুটে এলো অর্ক। পাগলের মতো বলতে থাকলো- “আমার বোন… আমার বোন কোথায়?”

আমি মৃদু হাসলাম, “রিল্যাক্স!”

অর্ক বলতে থাকলো, “কিসের রিল্যাক্স? তোর কথা মতো সব করেছি আমি। তোকে কিডন্যাপের মিথ্যে নাটক করেছি। ইচ্ছে করে পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছি। সারারাত পুলিশের মার খেয়েছি। অপহরণের মামলায় ফেঁসেছি। আর কি চাস তুই? এবার তো ছেড়ে দে আমার বোনটাকে!

আমি অভয়দানের হাসি হেসে বললাম, “তোমার ছোটো বোন বহাল তবিয়তে আছে, অর্ক। তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সে এখন বাসায়। তাকে আমার লোকেরা ধরে নিয়ে গিয়ে চোখ বেঁধে রেখেছিলো, রেগুলার খাবার-পানি দেওয়া হয়েছে, কেউ তার সাথে বাজে আচরণ করেনি। সো, তোমার টেনশনের কোন কারণ নাই”।

অর্ক সেলের গারদে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করলো।

আমি সরে যাচ্ছিলাম সেলের সামনে থেকে। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ায় ঘুরে তাকালাম অর্কের দিকে। বললাম, “ওহ! আরেকটা ব্যাপার তোমাকে জানিয়ে রাখি অর্ক। ৬ বছর আগে তোমাদের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিলো, তার পেছনেও আমারই হাত ছিলো। মৌরীকে আমি তখন থেকেই ভালোবাসতাম। তাকে পাওয়ার জন্য তোমাদের সম্পর্কটা ভেঙে দেওয়ার একটা প্ল্যান করেছিলাম। প্ল্যানটা কাজে লাগলো। তুমি চলে গেলে অ্যামেরিকা, আর মৌরীও আমার হয়ে গেলো!”

রাগে দুঃখে ফেটে পড়লো অর্ক, “ইউ… ইউ বাস্টার্ড…”

আমি মৃদু হেসে বললাম, “তুমি একটা কথা সেদিন ঠিকই বলেছিলে অর্ক। আমাদের তিনজনের গল্পে আমিই ভিলেন। কিন্তু আমি সেই ভিলেন নই যে গল্পের শেষে হেরে যায়! আই অ্যাম দ্যা ভিলেইন হু গেটস দ্যা গার্ল! মৌরী শুধুই আমার! আর কারো নয়…”

(সমাপ্ত)

লেখকঃ নাজিম উদ দৌলা
ঢাকা, ২৪/৮/২০১৯

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি