ছোট গল্প

চম্পা হাউজ

নতুন বাড়িতে উঠেছি দুই মাসও হয়নি। এরই মধ্যে নানান ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। সারাটা রাত আতংকে থাকি। আর দিনের বেলা যতটা সম্ভব বাড়ির বাইরে থাকার চেষ্টা করি। খুব কষ্টে আছি ভাই।

আমজাদ আলীর মতো একজন শিক্ষিত-সম্ভ্রান্ত লোকের মুখে এই ধরণের কথা শুনতে হাস্যকর লাগছে। আমি অতি কষ্টে হাসি গোপন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।

“এই যে আপনি হাসছেন!” আমজাদ আলী রেগে গেলেন। “আমি আগেই বলেছিলাম কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করবেন না!”

“আরে না না! হাসছি কোথায়?” আমি হাসি আটকে বললাম, “পুরো বিষয়টা কি একটু খুলে বলতে পারবেন?”

আমজাদ আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আর কিছু বলার লক্ষণ দেখছি না।

লোকটার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে খানিকক্ষণ আগে। দুজনে বসে আছি সুপ্রভাত বাসে। আটকে আছি গুলিস্তানের অভিশপ্ত জ্যামে। বাসে চেপে পুরান ঢাকা যাওয়া মানেই বিরাট ফ্যাসাদে পড়া। গুলিস্তানে আসার পর গাড়িগুলো যেন আর আগাতেই চায় না! অন্য কোন বাহনে যাবেন? সে তো আরেক ঝামেলা! রিক্সা কিংবা সিএনজিওয়ালা পুরান ঢাকার নাম শুনলেই সাত বার করে পানি খায়!

এমনিতেই প্রচন্ড গরমে ঘামছি দরদর করে, তার উপর গাড়ির হর্নের কর্কশ আওয়াজে কান ঝালাপালা হওয়ার দশা। তখনই আমার চোখ পড়লো আমজাদ আলীর উপরে। লোকটার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিলো ঝগড়াটে বউয়ের হাতে মার খেয়েছে! কেমন মুখ-চোখ কালো করে রেখেছে বেচারা! মধ্যবয়সী, মাথায় আধপাকা চুল, দেখে শুনে ভদ্রলোক বলে মনে হলো। লোকটার পাশের সিট ফাঁকা। তাই দেখে আমি সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। তার পাশে এসে বসলাম। সময় কাটানোর জন্য আমি তার সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম।

“এক্সকিউজ মি, একটু কথা বলতে পারি?”
লোকটা আমার দিকে বিরক্ত ভঙ্গিতে একবার তাকিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলো।
আজব লোক তো! সালামের জবাব পর্যন্ত দিলো না! আমি আবার ডাক দিলাম। “এই যে ভাই”।
“আমাকে বলছেন?”
“জি… আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম”।
“আপনাকে তো ঠিক পরিচিত বলে মনে হচ্ছে না”। সন্দেহের সুর বললো লোকটা।
“না, আপনি আমাকে ঠিক চিনবেন না”। আমি খানিক ইততস্ত করে বললাম, “আমরা সমবয়সী মানুষ… জ্যামের মধ্যে সময় কাটছে না। ভাবলাম আপনার সাথে একটু কথা বলি”।
“জি বলুন”। লোকটা অস্বস্তি ভরা কণ্ঠে বললো।
আমি করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম, “আমি আসিফ রহমান। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ”।
লোকটা আমার হাত ধরলো, “আমি আমজাদ আলী”।

এরপর দুই এক কথায় জানতে পারলাম আমজাদ আলী পেশায় একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংকার। গাড়িটা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেছে বলে বাধ্য হয়ে পাবলিক বাসে উঠেছেন। পাবলিক প্লেসে এভাবে যাতায়াত করার অভ্যাস নাই বলে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন।

আমি সহানুভূতির সুরে বললাম, “আপনার চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি গাড়ির জন্য মনটা খারাপ হয়ে আছে”।
“আসলে…” আমজাদ আলী এক মুহুর্ত থেমে থেকে বললো, “সেজন্য মন খারাপ নয়! গাড়ি তো নষ্ট হতেই পারে। অন্য একটা ঝামেলায় আছি…”
“ওহ! কি ধরণের ঝামেলা?”
“ব্যাপারটা একটু জটিল…” লোকটা ইততস্ত করছে। সম্ভবত বলবে কি বলবে না, ভাবছে।
আমি হাসি মুখে বললাম, “বলার মতো বিষয় না হলে বলার দরকার নেই”।
“না মানে… আসলে তা না…” আমজাদ আলীর দ্বিধা যাচ্ছে না। “বিষয়টা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনার কাছে হাস্যকর লাগতে পারে”।

আমি জোরাজুরি করায় আমজাদ আলী বোমাটা ফাটালেন! তার বাড়িটা নাকি ভুতের বাড়িতে পরিনত হয়েছে! আমি চেষ্টা করেও হাসি আটকাতে পারলাম না। তাই মনে হচ্ছে একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন তিনি। আর বলতে চাইছেন না কিছু।

তাকে পুরোটা খুলে বলার জন্য অনুরোধ করলাম আমি, “আমজাদ ভাই, আমি মানুষের বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সমাধান দিয়ে বেড়াই। এমন অনেক কিছুই আমাকে বিশ্বাস করতে হয়, যা অন্যদের কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। নির্ভয়ে বলতে পারেন আপনার সমস্যা! চিন্তা করবেন না, ভিজিট চাইবো না!”

আমজাদ আলী হাসলেন। এবার আর সন্দেহ ভরা হাসি নয়, একদম প্রান খোলা হাসি যাকে বলে। বলতে শুরু করলেন-

আমি আমার পরিবার নিয়ে উত্তরায় নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকতাম। বছর খানেক আগে প্রমোশন পেয়ে ব্যাংকের বাংলাবাজার শাখার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হয়েছি। কিন্তু উত্তরা থেকে পুরনো ঢাকায় যাতায়াত করতে কি পরিমান কষ্ট হয়, তা তো বুঝতেই পারছেন। শেষে বাধ্য হয়ে পুরান ঢাকায় বাসা দেখতে শুরু করলাম। ইসলামপুরের দিকে একটা ডুপ্লেক্স সিস্টেমের বাড়ি পেয়ে গেলাম, বিক্রি হবে। বাড়ির নামঃ চম্পা হাউজ। মালিক থাকে দেশের বাইরে, দেশে আর ফেরার ইচ্ছে নেই। তাই বাড়িটা বাজার মুল্যের অর্ধেক দামেই বিক্রি করে দেবে। দেখলাম দামটা আমার সাধ্যের মধ্যেই আছে। খুব বেশি চিন্তা না করেই কিনে ফেললাম। এবং কেনার পর জানতে পারলাম আসল কাহিনী।

ঐ বাড়ির মালিকের বড় বোন ছিল চম্পা, তার নামেই বাড়িটি নামকরন করেছিলেন তাদের পিতা। মেয়েটি অল্প বয়সে গলায় দড়ি দিয়ে মারা যায়। তারপর থেকেই বাড়িটি হন্টেড বাড়ি হিসেবে পরিচিত। সেখানে নাকি অনেক ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড ঘটে। অনেককাল যাবত খালি পড়ে আছে বাড়ি, কেউ কিনতে আগ্রহী হয় না। ভুতুড়ে বাড়ি কে কিনবে বলুন? শেষে বাধ্য হয়ে মালিক অর্ধেক দামেই ছেড়ে দিয়েছে। আমার কাছে ব্যাপারগুলো খুবই হাস্যকর বলে মনে হচ্ছিল। এই টুইন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে এসে ভুতের ভয়? এগুলো নিছক গুঁজব ছাড়া কিছুই নয়। আমি বাড়িটা একটু রিনোভেশন করালাম। উত্তরার ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়ে দিলাম। পরিবার-পরিজন নিয়ে চম্পা হাউজে এসে উঠলাম। কিসের ভুত? সবই স্বাভাবিক। বিশাল বাড়িতে দারুন সময় কাটছিল আমার পরিবারের সবার। কিন্তু মাসখানেক পর অদ্ভুত সব কান্ড ঘটতে শুরু করলো বাড়িতে। বাড়ির সব দরজা জানালা হুট হাট খুলে যাচ্ছে, আবার আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান না হতেই দেখা দিলো নতুন সমস্যা। বিভিন্ন কক্ষের লাইট ফ্যান সব আপনা থেকেই জ্বলছে, নিভছে! প্রথমে মনে হল বৈদ্যুতিক গোলযোগ। কিন্তু ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী এনে সারাবাড়ি পরীক্ষা করিয়েও কোন সমস্যা পেলাম না। মনে হচ্ছে কেউ যেন ইচ্ছাকৃত ভাবে করছে কাজটা!

এদিকে পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে বাড়িটির ভুতুড়ে কর্মকাণ্ডের কথা শুনে আমার স্ত্রী সন্তানদের ভয় বাড়তে থাকলো। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করলো এগুলো আসলেই ভুতের কাজ! আমি তখনও বিশ্বাস করি নি। কিন্তু এরপর এমন একটা ঘটনা ঘটলো যে বিশ্বাস না করে পারলাম না। এক সন্ধায় বাড়ির ছাঁদে উঠেছিলাম হাওয়া খেতে। হঠাৎ কেউ একজন আমার পেছন থেকে পিঠে হাত রাখলো। ঘুরে দেখলাম একটা সাদা কাপড় পড়া মেয়ে আলুথালু বেশে দাঁড়িয়ে আছে। বললো, “প্রিয়তম! আমি তোমার চম্পা!” আমি আতংকে চিৎকার করে জ্ঞান হারালাম। এই ঘটনার পর আমরা বিকেলের পর ছাদে ওঠাও বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু চম্পার আত্মা আমাদের ছাড়লো না। হঠাৎ ড্রয়িং রুমের সোফায় কিংবা বেডরুমের বিছানায় চম্পার আত্মা দেখা যায়! তাকে দেখে পরিবারের সদস্যরা ভয়ে আর্ত-চিৎকার শুরু করে। ফকির কবিরাজ এনে অনেক ঝাড়ফুঁকও করা হয়েছে। কিন্তু কোন ফল হয়নি। একটা মাস যাবত আতংকের মধ্যে বসবাস করছি!

আমজাদ আলী একটানা কথাগুলো বলার পর থামলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এখন কি করবেন ভাবছেন?”
“চিন্তা করছি বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে আবার উত্তরার ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠবো। এভাবে আতংকের মধ্যে তো বসবাস করা যায় না! কি সুন্দর একটা বাড়ি ভাইজান! এটা ছেড়ে চলে যাব ভাবতেও খারাপ লাগছে”।
“তাহলে বাড়ির কি হবে?”
“বাড়ি ভেঙে নতুন করে বড় এপার্টমেন্ট বিল্ডিং বানাবো। কোন ডেভেলপার কোম্পানিকে দেব না। নিজের খরচে বানাবো। সেজন্য অবশ্য অনেক টাকার প্রয়োজন। অন্তত ৫ বছর টাকা জমাতে হবে”।
“৫ বছর! ততদিন কি বাড়িটা খালি ফেলে রাখবেন?”
“এ ছাড়া আর উপায় কি বলুন?”
কথাটা শুনে আমি ঠোট টিপে হাসলাম। “আমার কাছে কি মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটাই আপনাদের মনের ভুল”।
“হোয়াট?” লোকটা রেগে গেল এবার। “কে বলেছে সব মনের ভুল?”
“বুঝিয়ে বলছি ভাই”। আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। “আপনারা বাড়িতে উঠেছেন মাস দুয়েক হয়েছে তাই না? প্রথম একমাস ভালোই ছিলেন, তারপর থেকে শুরু হলো এইসব…”

আমজাদ আলী হ্যা-বোধক মাথা নাড়লেন।

“নির্জন বাড়ি, পুরনো দেয়াল-দরজা-জানালা, এমনিতেই একটা ভুতুড়ে ভাব আছে বাড়িতে। তার উপর একটা মাস আপনারা প্রতিবেশীদের মুখে বিভিন্ন ভুতুড়ে ঘটনার কথা শুনেছেন। ফলে ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ের অনুভূতি বেঁধেছে আপনাদের মনে। একা থাকা অবস্থায় সেই ভয় আতংকে রুপ নেয়। আর ঠিক তখনই আপনারা হ্যালুসিনেসন দেখছেন। আসলে ভুতুড়ে ব্যাপার কিছুই নেই এখানে”।

“কিন্তু… আমি যে চোখের সামনে মৃত চম্পার আত্মাকে দেখলাম! সেটাও মনের ভুল?”

“জি”। আমি হ্যা-বোধক মাথা নাড়লাম। “লোকের মুখে শুনে আপনার কল্পনা জগতে চম্পার একটা অবয়ব সৃষ্টি হয়েছে। আর হ্যালুসিনেশন এর সময় সেই অবয়বই চোখের সামনে ফুটে ওঠে। পরিবারের বাকি সদস্যদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে”।

“ফাজলামি করেন আমার সাথে?” লোকটা রাগে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। “একটা জলজ্যান্ত নারীমুর্তি আমরা কল্পনায় দেখি? যে সমস্যায় আমরা বাড়ি ছাড়তে চলেছি, সেই সমস্যা এত সহজে মুখেমুখে সমাধান করে দিলেন? নিজেকে কি ভাবেন আপনি? মিসির আলী?”

আমি মিস্টি করে হেসে বললাম, “আসলে আপনাকে আমার পরিচয় পুরোটা দেইনি। আমি পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক হলেও, প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবেও কাজ করি। এ পর্যন্ত ১০০ এর অধিক প্যারানরমাল ইন্সিডেন্ট তদন্ত করেছি আমি। প্রতিবারই দেখা যায়, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ মনের ভুল”।

“আপনি কি প্রমান করতে পারবেন চম্পার বিষয়টা আমাদের মনের ভুল?
“জি পারবো”। আমি সম্মতি জানালাম।
“যদি পারেন তাহলে যত টাকা চান, আমি দেব। চলুন আমার সাথে”।
“কোথায়?” আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম।
“আমার বাসায়। সেখানে ২৪ ঘণ্টা থাকবেন আপনি এবং প্রমান করবেন যা ঘটে সব মনের ভুল”।
“কিন্তু আমি তো বাড়ি যাচ্ছি…” আমি হতবাক কণ্ঠে বললাম, “সদরঘাট যেতে হবে আমাকে। লঞ্চের টিকিট কাটা হয়ে গেছে…”
“আরে রাখেন তো বাড়ি”। লোকটা নাছোড়বান্দার মতো মাঝা ঝাঁকাল। “একদিন পরে যাবেন না হয়। লঞ্চের টিকিট আমি কেটে দেব আবার”।

***

নাছোড়বান্দা আমজাদ আলীর জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে তার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। তিনি পরিবারের সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর হিসেবে। ভদ্রলোকের স্ত্রী মানুষ হিসেবে খুব ভাল, অমায়িক। দুই ছেলে, এক মেয়ে- তারাও খুব ভদ্র।

আমি দুপুরের খাবার খেয়েই কাজে লেগে পড়লাম। বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গন্ধ পাচ্ছিলাম। তাই গন্ধের উৎস খুঁজতে শুরু করলাম। বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করলাম পরীক্ষা। একদম প্রত্যেকটা ইঞ্চি পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর একে একে প্রত্যেকটা রুমে ঘুরলাম। বলা বাহুল্য কোথাও কোন অসামঞ্জস্য চোখে পড়লো না। সব কিছুই একদম স্বাভাবিক। এমনকি দরজা জানালা আপনা থেকে খোলা কিংবা লাইট নিজ থেকে জলা নেভার ঘটনাও ঘটলো না। বিকেল নাগাদ কিচেন ঘরটা পরিস্কার করতে গিয়ে আমি তাদের এই হ্যালুসিনেশন এর কারণ খুঁজে পেলাম। পুরনো আমলের বাড়ি, কিচেনের ধোয়া বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ফার্নেস বানানো হয়েছে। সেই ফার্নেসে বড় একটা ফাটল ধরেছে। ফলে ধোয়াগুলো বাড়ির বাইরে না গিয়ে, ফাটল দিয়ে বের হয়ে সিলিং এ বাড়ি খেয়ে কুন্ডুলি পাকাচ্ছে। তারপর ছড়িয়ে যাচ্ছে সারা ঘরময়। এই জন্যই কেমন যেন একটা ভ্যাপসা টাইপের গন্ধ বাড়ির ভেতরে।

“আমজাদ সাহেব, আপনাদের ভুত দেখার কারণ তো পেয়ে গেছি”।
“কই?”
আমি তাকে কিচেনে নিয়ে গিয়ে দেখালাম, “ঐ যে দেখেন ফার্নেসে ফাটল। কিচেনের ধোয়া বাইরে যাচ্ছে না, ছড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ির ভেতর চারিদিকে”।
“তার সাথে ভুত দেখার কি সম্পর্ক?” আমজাদ আলী হতবাক।

আমি বুঝিয়ে দিলাম বিষয়টা, “শুনুন, কিচেনের ধোঁয়ায় আছে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস। এই গ্যাস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এবং বিষাক্ত। এই গ্যাসের ভেতর খুব বেশিক্ষন থাকলে মানুষ এক প্রকার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। কার্বন মনোক্সাইড ব্রেইনে গিয়ে ইফেক্ট করে এবং ব্রেইনের নিয়ন্ত্রন অনেকটাই হারিয়ে ফেলে মানুষ। ফলে তারা হ্যালুসিনেশনের বশে এমন কিছু দেখে যা তার চোখের সামনে নেই। আপনারা সবাই এই কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এদিকে পাড়া প্রতিবেশীদের মুখে এই বাড়ির ভুতুড়ে কর্মকাণ্ডের কথা শুনে শুনে একটা ভয়ের অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে আপনাদের মধ্যে। তাই হ্যালুসিনেশনের বশে আপনারা চম্পাকে দেখছেন বাসার মধ্যে। এটা আসলে আপনাদের মনের ভুল। ঐ ফার্নেস ঠিক করার পর দেখবেন সব ঠিক হয়ে গেছে”।

“স্ট্রেঞ্জ”। আমজাদ আলীর কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে আমার কথা বিশ্বাস করছেন না।

তার বড় ছেলে মোবাইল হাতে গুতাগুতি করছিল। সে হঠাৎ বলে উঠলো, “আব্বু। এই আঙ্কেল আসলেই ঠিক বলেছেন। ইন্টারনেট ঘেটে আমিও একই তথ্য পেলাম। ডঃ উইলিয়াম ভিলমার আমেরিকান জার্নাল অব অফথালমোলজিতে আমাদের পরিবারের মতো একটা পরিবারে ঘটে যাওয়া ভুতুড়ে ঘটনার কথা বলেছেন। তারা আমেরিকার কোন এক রাজ্যের একটি নির্জন এলাকায় একটা দোতালা কাঠের বাড়িতে বসবাস করতো। সেখানে নানার ভুতুড়ে কান্ড ঘটতো। সেই পরিবারের দিন কাটছিলো ভয় ও আতংকে। ঠিক এমন সময় পরিবারের একজন দেখলো তাদের বাড়ির ফার্নেসটাতে মারাত্মক ত্রুটি আছে। ফলে পুরো পরিবার কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার শিকার! এই ফার্নেসটি মেরামত করে দেওয়ার পর থেকে ভুতের উপদ্রব বন্ধ হয়ে গেলো। এরপর থেকে আর কখনও বাড়ির লোকেরা ভুত দেখেনি”।

ভদ্রলোক তৎক্ষণাৎ মিস্ত্রীকে খবর দিল এসে ফার্নেস ঠিক করার জন্য। ফার্নেস মেরামত হয়ে গেল। তারপর ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল এবং বলা বাহুল্য যে, কোন প্রকার অস্বাভাবিক কিছুই ঘটলো না।

আমজাদ সাহেব বুঝতে পরলেন যে আমার কথা ভিত্তিহিন নয়। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “আপনি ঠিক বলেছেন, বিষয়টা আসলেই আমাদের মনের ভুল ছিল। মাফ করবেন ভাই। রেগে গিয়ে আপনাকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে ফেলেছি”।
“আরে না না কি যে বলেন”। আমিও ভদ্রতার হাসি হাসলাম।
“আপনাকে বলেছিলাম যত টাকা চান দেব। কত দিব বলেন?”
“আমার কিছুই লাগবে না ভাই”। আমি প্রবল বেগে মাথা নাড়লাম। “আপনারা নতুন বাড়ি কিনেছেন। এখানে একটু শান্তিতে থাকেন, এই কামনাই শুধু করি”।

ভদ্রলোক জোর জবরদস্তি করে আমাকে একটা ২০ হাজার টাকার চেক লিখে দিলেন। আমি চলে যেতে চাইলেও তিনি দিলেন না। “রাত হয়ে গেছে ভাই। এত রাতে আর লঞ্চে উঠবেন না। আমি কাল সকালে আপনাকে টিকিট কেটে লঞ্চে উঠিয়ে দিব”।

অগত্যা কি আর করা? রাতটা থেকে গেলাম তার বাসায়। আমার থাকার জন্য গেস্ট রুমটা রেডি করে দেওয়া হল। রাতে ভরপেট খাওয়া দাওয়া করে ঘুমুতে গেলাম। আরামদায়ক বিছনায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে আসলো। কিন্তু ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি কি অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য!

***

মাঝ রাত। আমি গভীর ঘুমে মগ্ন। মনে হলো কেউ একজন আমার গা থেকে চাদর টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি ঘুমের ঘোরে হাতরে হাতরে আবার গায়ের উপর চাদর টেনে নিলাম। আবার যেন কেউ টান দিয়ে নিয়ে গেলো। আবার চাদর টেনে নিলাম। একই ঘটনা তিনবার ঘটার পর আমার ঘুম ভেঙে গেলো। উঠে বসলাম। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না। বারকয়েক চোখ পিট পিট করতেই অন্ধকার একটু সয়ে এলো। আধো অন্ধকার-আধো আলোতে বিছানার পাশে একটা মানুষের অবয়ব দেখতে পেলাম। সাদা শাড়ি পড়া একজন নারী। দেখার সাথে সাথে আতংকের একটা স্রোত উঠল আমার শিরদাঁড়া বেয়ে।

“কে… কে আপনি?”

নারী মুর্তি অসম্ভব চিকন কণ্ঠে বলে উঠলো, “প্রিয়তম, আমি তোমার চম্পা!”

আমার দুই হাত-পা প্রচন্ড আতংকে ঠক ঠক করে কাপতে শুরু করলো। “আ… আমার কাছে কি চাও?”

“তুমি আমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাও কেন?”

ভয়ে আমার গলা দিয়ে আওয়াজ আসছে না। কাঁপছি মৃগী রোগীদের মতো। চম্পা আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি প্রচন্ড আতংকে জমে গেছি। নড়তে পারছি না একচুলও। চম্পা এক হাত বাড়িয়ে আমার গলা ধরলও। শীতল হাতের ছয়া পেয়ে আমার সমস্ত শরীরে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো। প্রচন্ড শব্দে চিৎকার করে উঠলাম, “কে আছ? বাচাও…!!”

চম্পা আমাকে এক হাতে তুলে আছড়ে ফেললো মাটিতে। আমি আবার চিৎকার করে উঠলাম, “ওরে বাবারে… গেছিরে…”

বাড়ির লোকজন সব দৌড়ে এলো চিৎকার শুনে। ঘরের লাইট জ্বালাতেই দেখি- চম্পা নেই! আমি আছাড় খেয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি করছি। সবাই আমাকে তুলে ধরে বিছানায় নিয়ে শোয়ালো। প্রচন্ড আতংকে থরথর করে কাঁপছি। তারা আমার গায়ে চাদর মুড়িয়ে দিলো।

আমজাদ আলী উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কি হয়েছে আসিফ সাহেব?”

“চ… চম্পা! চম্পা এসেছিল…” কাঁপুনির চোটে ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না আমি। “আ… আমাকে মেরে ফেলতে চায়!”

আমজাদ আলীর হতাশ কণ্ঠে বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম ভাই। এটা হ্যালুসিনেশন নয়!”

আমজাদ আলীর মেয়েটা টিটকারির সুরে বলে উঠলো, “চম্পাকে তো আমরাও দেখেছি। আপনি এতো বেশি ভয় পাচ্ছেন কেন?”

“চুপ বজ্জাত মাইয়া!” আমি রেগে গেলাম। “তোরা খালি দেখছোস! আর আমারে তুইল্লা আছার দিছে! মাজার হাড্ডি মনে হয় গুড়া হইয়া গেছে! ওরে মাগো…”

***

এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই আমজাদ সাহেব তাদের উত্তরার ফ্ল্যাটটি খালি করালেন। তারপর চম্পা হাউজের দরজা-জানালা সব তালা দিয়ে, পরিবার পরিজন নিয়ে উত্তরায় চলে গেলেন। বাড়ি ভেঙে নতুন করে বানানোর আগে আর চম্পা হাউজে পা দেবেন না! সেই টাকা যোগাড় হতেও লাগবে অন্তত ৫ বছর!

আমজাদ সাহেব তো পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেলেন। কিন্তু আমি এত সহজে বিষয়টা মেনে নিতে পারলাম না! আমার মতো একজন প্যারানরমাল বিশেষজ্ঞকে একটা পেত্নি তুলে আছাড় দিয়েছে! এটা আমি মেনে নেই কি করে? সাহস সঞ্চয় করলাম। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলাম যে আরও আরও একবার যাব সেই বাড়িতে। ঐ পেত্নির সাথে একটা বোঝাপড়া করতেই হবে!

নির্দিষ্ট দিনে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটা ব্যাগে ভরে রেডি হয়ে চম্পা হাউজে গেলাম। পাচিল টপকে বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করলাম। দরজাগুলো সব তালা দেওয়া। কিন্তু সেদিন পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে গিয়ে বাড়ির কয়েকটা গোপন প্রবেশ পথ চোখে পড়েছিলো আমার। সেগুলোর একটা ব্যবহার করে ঢুকে পড়লাম বাড়ির ভেতরে।

মাঝখানের বড় রুমটাতে এসে দাঁড়ালাম। এই রুম থেকে প্রায় সবগুলো রুমের দরজা দেখা যায়। আমি ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখলাম। দুই হাতে হাত তালি দিয়ে বললাম, “কই রে চম্পা? কই তুই? সাহস থাকলে সামনে আয়!”

নূপুরের শব্দ শোনা গেল। সাথে কাঁচের চুরির টুং টাং আওয়াজ। এলো চুলে সাদা শাড়ি পড়া নারীমুর্তি বেরিয়ে এলো একটা ঘর থেকে। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “প্রিয়তম, তুমি এসেছ?”

আমি হাসি মুখে দুই হাত বাড়িয়ে ধরে বললাম, “হ্যা, আমি এসেছি!”

নারীমুর্তিটি দৌড়ে ছুটে এলো। ঝাপিয়ে পড়লো আমার বুকে। আমি আমার মাথার পরচুলা আর আলগা গোঁফ খুলে ফেললাম। তারপর নিজের স্ত্রীকে বুকের মধ্যে পরম যত্নে জড়িয়ে ধরলাম। হাসি মুখে বললাম, “অভিনয়টা কেমন করলাম বলো তো?”

“তুমি তো অভিনয় করেছ কেবল একদিন”। নিপুণ চোখ মুখ পাকিয়ে বললো, “আমি যে এক মাস ধরে অভিনয় করছি?”

প্ল্যান সাকসেসফুল! নিপুণ আর আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করার পর থাকার যায়গা নিয়ে খুব সমস্যায় ছিলাম। আজ থেকে আর সেই টেনশন নেই। অন্তত ৫ বছরের জন্য নিশ্চিন্ত!

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি