বড় গল্প

গল্পঃ কবি

পার্কের একটা বেঞ্চে বসে এক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত। তাদের কাছাকাছি কয়েকটা কাক ঘুরছে। মাটিতে কিছু একটা পড়ে আছে, খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে- দুইটা টোকাই ছেলে কাগজ টোকাচ্ছে, আরও একটু দূরে দৃষ্টি গেলে দেখা যায় এক ভিখারিনী মহিলা গাছের নিচে বসে তার সন্তান কে খাওয়াচ্ছে। এক চাওয়ালা চায়ের ফ্ল্যাক্স নিয়ে সবার কাছে একবার করে যাচ্ছে। কেউ কেউ চা খাচ্ছে, কেউ খাচ্ছে না। তবে বাদামওয়ালা সবার কাছ থেকেই বিতারিত হচ্ছে! মানুষ এখন আর বাদাম খায় না!

এই মুহুর্তে এমন টুকরো টুকরো অনেক দৃশ্যই চোখে পড়ছে আমার। আমি শুয়ে আছি রমনা পার্কের ভেতর একটা বেঞ্চে। উদ্দেশ্যহীন ভাবে মানুষের কর্মকান্ড দেখছি। প্রেমিক যুগল ঝগড়ার মাঝেই সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথায় অযত্নে বেড়ে ওঠা বড় বড় চুল- হিরোইন খোর বা চোর ছ্যাঁচড় ভাবছে বোধহয়! ভাবুক গে! কি আসে যায় তাতে?

পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠল। বেজে উঠল বললে ভুল হবে, ভাইব্রেশন হল। মোবাইলের রিংটোন আমার ভালো লাগে না। চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটায়। তবে ভাইব্রেশনটা বেশ লাগে! মোবাইলের এই ভাইব্রেশন নামক ফাংশনটির তুলনা চলেনা! কেমন যেন একটা ভুপিকম্প ভুমিকম্প অনুভব হয়! অন্য কেউ হলে এতক্ষনে পকেট থেকে মোবাইল বের করে কে ফোন করে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো। কিন্তু আমি তা করছিনা, ইচ্ছে করেই করছিনা! জানিই তো কে ফোন দিয়েছে। আমাকে ঐ একজনই তো ফোন দেয়!

কানিজ!!

নামটা মাথায় আসলেই আমার সমস্ত শরীরে একটা ভাললাগার আবেশ ছড়িয়ে যায়। এই মেয়েটির সাথে আমার পরিচয় হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি! কিন্তু এরই মাঝে সে আমার অস্তিত্বের একটি অংশ হয়ে গেছে! এতো অল্প সময়ে কাউকে এতো বেশি ভালো লেগে যেতে পারে, আমি তা কখনও ভাবতেও পারিনি। তাই বলে সারাক্ষণ কানিজের সাথে ঘুরাঘুরি করছি এমনটা নয়! বেশি ভালো লাগলে বেশি কাছে থাকতে হবে- এমন তো কোন কথা নেই!

গত তিনদিন ধরে প্রতিদিনই কমপক্ষে ২০ বার করে ফোন করেছে কানিজ। আমি রিসিভ করিনি। অসংখ্য মেসেজ দিয়েছে কানিজ। আমি মেসেজ পড়ে পড়ে রেখে দিয়েছি। রিপ্লাই করিনি। আসলে এই কয়দিন কারো সাথেই খুব একটা কথা বলছি না! ভাল লাগেনা কথা বলতে। মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে।

আমার মন খারাপ হওয়ার জন্য অবশ্য কোনও কারন লাগেনা। মাঝে মাঝে এমনিতেই মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু এবারের মন খারাপ খারাপটা এমনি এমনি হয়নি। গত তিনদিন কানিজের বাবা শক্ত কিছু শুনিয়েছে আমাকে। সেসব কথা এক ঝটকায় আমাকে কাব্যের পৃথিবী থেকে তুলে এনে আছড়ে ফেলেছে বাস্তবতার গহীন সমুদ্রে!

***

কানিজের সাথে আমার পরিচয় অনেকটা বাংলা সিনেমার কাহিনির মত।

প্রায় মাস তিনেক আগের কথা।

আমি তখন মতিঝিল এলাকায় গিয়েছিলাম একটা কাজে। শাপলা চত্বর হয়ে সিনেমা হলটার দিকে যাচ্ছি, এমন সময় চারিদিকে হই চই পরে গেলো। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম একদল লোক লাঠি সোটা হাতে দৌড়ে এসে গাড়ি ভাংচুর শুরু করল।

বুঝলাম শেয়ার বাজারের অবস্থা ভালনা, তাই শেয়ার হোল্ডাররা সবাই অতিষ্ঠ হয়ে রাস্তায় নেমেছে। সবাই যে যার মত পালাচ্ছে। আমিও নিরাপদ জায়গায় সরে যাওয়ার জন্য ছুট দিলাম। হঠাৎ খেয়াল হলো ফুটপাতে একটা মেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। সম্ভবত দৌড় দিতে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে ব্যথা পেয়েছে।

আমি মেয়েটার কাছে দ্রুত এগিয়ে গেলাম। উঠিয়ে দাড় করানোর চেষ্টা করলাম। রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছে, কপাল থেকে রক্ত ঝরছে। কাপছে হিস্ট্রিরিয়াগ্রস্ত রোগীদের মত। আমি একটা রিকসা ডেকে মেয়েটিকে উঠিয়ে দিলাম কিন্তু মেয়েটি আমার হাত ছাড়ল না। সম্ভবত প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। কি আর করা? আমাকেও রিক্সায় উঠতে হলো।

একটা ফার্মেসির সামনে রিকসা থামালাম। তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। একটু ছিলে গেছে। কিন্তু মেয়েটি ভয় পেয়েছিল ভীষণ। কপালে ব্যান্ডেজ করা হল। মেয়েটি আমায় অনেক ধন্যবাদ দিল। কথায় কথায় জানতে পারলাম তার নাম কানিজ, একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছে। মেয়েটি খুব আহামরি গোছের সুন্দরী নয়, কিন্তু চেহারাটা ছিল ভারী মিষ্টি আর আকর্ষণীয়।

মেয়েটি আমার ফোন নম্বর নিয়েছিল। সেই রাতেই আমাকে সে ফোন করলো। অনেক কথা হল তার সাথে। আবিস্কার করলাম, অনেক বিষয়েই আমাদের দুজনের চিন্তা ভাবনায় ব্যাপক মিল। পরদিন কানিজ টিএসসি তে এসে আমার সাথে দেখা করলো। এভাবে একদিন দুইদিন দেখা হলো, ফোনে কথা হল। এক সময় আমরা অজান্তেই পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেলাম। কিন্তু এই প্রেমের পরিণতি কি হতে পারে তা চিন্তা করে দেখিনি কখনও। কয়েকদিন আগে কানিজের বাবা আমাকে সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিলেন!

***

আমি যেতে চাইনি। কানিজ এক প্রকার জোর করেই আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। তাদের রাজ-প্রাসাদের মতো বাড়িটা আগে শুধু বাইরে থেকেই দেখেছি। এবার ভিতরে ঢুকে আমি তো রীতিমত ভয় পেয়ে গেলাম! কানিজ আমাকে তাদের দামী ও সৌখিন আসবাবপত্র আর রুচিসম্মতভাবে সাজানো ড্রয়িং রুমে বসতে দিয়ে ভেতরে চলে গেলো। আমি ঘরের সিলিঙ থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি, দেয়ালের পেইন্টিংস আর সো-পিস গুলো মুগ্ধ চোখে দেখছিলাম। এমন সময় কানিজের বাবা আসলেন।

ভদ্রলোকের নাম জামান আহমেদ। আগে কখনো দেখা হয়নি তার সাথে। বয়স ৬০ এর মত হবে। চেহারায় আর বেশ-ভূষায় আছে আভিজাত্য ও জৌলুসের ছাপ।

ভদ্রলোক আমার মুখোমুখি বসলেন। “তোমার নামই অর্ক?”

“জি”।

“তুমি কি কর?” ভারি কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন করলেন।

“সমাজকল্যাণে অনার্স করেছি। মাস্টার্সে ভর্তি হইনি এখনও”।

“কেন?”

“আমার আসলে লেখাপড়া আর ভাল লাগছে না”।

“চাকরির চেষ্টা করছ?”

“জি… না! এখনও তেমনভাবে চেষ্টা করছি না।”

“চলে কি করে?”

“এইতো… চলে যাচ্ছে একভাবে…”।

কানিজের বাবার চেহারা দেখে বুঝলাম আমার একটা প্রশ্নের উত্তরও তার পছন্দ হচ্ছে না! তিনি তাই প্রশ্নের ধরণ পাল্টালেন এবার, “বাসায় কে কে আছে?”

“কেউ নেই। বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। ছোট ভাইটা কানাডায় থাকে, বড় বোন আছে- বিয়ে হয়েছে, ময়মনসিংহে বাড়ি। আমি একটা মেসে থাকি।”

“বাহ! খুব ভালো!” বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বললেন জামান সাহেব।

আমি বলার মতো কিছু না পেয়ে চুপ করে থাকলাম।

“যাই হোক… তোমার সামনে কি করার ইচ্ছা?”

“এখনো ঠিক করিনি। আমি স্বাধীনচেতা। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে পছন্দ করি। আসলে চাকরি করে আমার পোষাবে না”।

কানিজের বাবা বিদ্রুপের ভঙ্গিতে একটু হাসলেন। “কানিজের মুখে শুনলাম তুমি ভাল কবিতা লেখ! পত্র পত্রিকায় প্রায়ই ছাপানো হয়”।

“হ্যাঁ… একটু চেষ্টা করি আরকি”।

“আমার সম্পর্কে তোমার ধারনা আছে তো?” জামান সাহেব ভ্রু উঁচিয়ে বললেন, “আমি শিল্পপতি। ঢাকায় ২টা বাড়ি আছে, ৪টা গাড়ি আছে- এসব জানো নিশ্চয়ই?”

“হ্যাঁ জানি”।

“তাহলে তো তুমি ভাল করেই জানতে যে আমার ফ্যামিলি স্ট্যাটাস তোমাদের থেকে অনেক উপরে!” এবার সরাসরি আক্রমন করলেন জামান সাহেব। “এসব জেনেও কানিজের সাথে রিলেশন করাটা কি তোমার ঠিক হয়েছে? কানিজের না হয় অল্প বয়স, তোমার লেখা দুই চার লাইন কবিতা পড়ে গলে গেছে। অত হিসেব করেনি। কিন্তু তুমি তো বিচক্ষন, তাই না? তুমি তাকে প্রশ্রয় দিলে কি করে?”

আমি চরম অপমানিত বোধ করছি। আমাকে কানিজের বাবার পছন্দ হবে না- এটা জানা ছিল। কিন্তু উনি যে এমন ব্যক্তি আক্রমন করে কথা বলতে পারেন, তা ধারণা করি নি। এক মুহুর্ত চুপ করে থাকার পর বললাম, “দেখুন, রিলেশন করার আগে এত কিছু দেখার প্রয়োজন মনে করিনি আমি। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়- সে মানুষ। উঁচু-নিচু, জাত-পাত, এসব ব্যবধান তো আমরাই সৃষ্টি করেছি, আমরাই মানি। কিন্তু ভালোবাসা এসব ব্যবধান মেনে হয় না!”

“বাজে কথা বলোনা ছেলে”। হুংকার দিয়ে উঠলেন জামান সাহেব। “তোমাদের মত ছেলেদের চিনতে আমার আর বাকি নেই। তুমি সব কিছু প্ল্যান প্রোগ্রাম করেই কানিজের সাথে সম্পর্ক করেছ। কানিজ অবুঝ, উঠতি বয়স তার, চোখে রঙ্গিন স্বপ্ন। মিষ্টি মিষ্টি কথা আর কবিতা শুনিয়ে তাকে বশে আনতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি তোমার! বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করে সারা জীবন পায়ের উপর পা তুলে বসে খাওয়ার ধান্দা!”

রাগে আমার শরীরে যেন আগুন ধরে গেল। এই মুহূর্তে এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে মন চাইছে। কিন্তু মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বসে থাকলাম।

“তোমার গায়ের শার্ট টা তো দামী মনে হচ্ছে! নিশ্চয়ই কানিজ কিনে দিয়েছে?”

আমি উত্তর দিলাম না। কানিজের বাবা ঠিক ধরেছেন। শার্ট টা কানিজই আমাকে গিফট করেছে। পায়ের জুতোজোড়াও কানিজের গিফট করা। পকেটে যে দামী ফোন, সেটাও কানিজ গিফট করেছে। আমি নিতে চাই না। কিন্তু কানিজ জোর করে এসব আমাকে দেয়। তার নাকি দিতে ভাল লাগে। না নিলে মাইন্ড করে, কান্নাকাটি করে। তাই বাধ্য হয়ে নিতে হয়!

জামান সাহেব উঠে দাড়ালেন। “আশা করি তোমার ও কানিজের ব্যাপারে আমার মতামত বুঝতে পেরেছ? আমি যাচ্ছি, তুমি কিন্তু চা না খেয়ে যাবেনা! আমি বাজি ধরে বলতে পারি এত দামী চা আগে কখনো খাওয়ার সৌভাগ্য তোমার হয়নি!”

জামান সাহেব ড্রয়িং রুম থেকে বেড়িয়ে যেতেই আমি ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। রাগে আমার শরীর কাপছে। ৫ মিনিট বাদেই নিজেকে আবিস্কার করলাম মহাখালী ফ্লাই ওভারের ওপর! প্রচণ্ড রাগে কখন যে কানিজদের বাসা থেকে বেড়িয়ে এসেছি তা টেরই পাইনি!

এর পর তিন দিন যাবত কানিজ ফোন দিয়েই যাচ্ছে। আমি রিসিভ করিনা। কি লাভ? জামান সাহেব তো চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের ব্যবধানটা দেখিয়ে দিলেন! আমাদের সম্পর্কে তার মত নেই, এটাও স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিলেন। এরপর আর মায়া বাড়িয়ে কি লাভ?

***

মোবাইলটা ভাইব্রেশন হয়েই চলেছে। পকেট থেকে বের করে হাতে নিলাম। এই সেরেছে! কানিজের ফোন না। কল করেছে আমার বন্ধু হামিদ।

রিসিভ করলাম, “হ্যালো”!

“তোর হ্যালোর গুষ্টি কিলাই”। ওপাশ থেকে রাগি গলায় হামিদ বলল। “শালা! এতক্ষনে ফোন ধরলি?”

মিথ্যে না বলে উপায় নেই। “কি করব দোস্ত? টের পাই নাই যে!”

“এই কথা কইলে তো হইবনা! তোর শাস্তি আছে”।

“কি শাস্তি দিবি বল”।

“ফোনে কমু না, তুই এখনি আমার অফিসে চইলা আয়”।

“এখনই? কেন? হঠাৎ জরুরি তলব?”

“আছে একটা ঘটনা। তুই আয়, তারপর বলমু”।

“আর কেউ আসছে?”

“হ্যাঁ… আনোয়ার আর কামাল আসছে। চার কাপ চা অর্ডার দিছি। চা ঠাণ্ডা হওয়ার আগেই চইলা আয়’।

‘আরে…আসতেছি। সমস্যা নাই, আমি ঠাণ্ডা চা খেতে পারি”।

হামিদের অফিস আজিজ মার্কেটে। ছোট খাটো একটা ট্রাভেল এজেন্সি দিয়েছে সে। রমনা থেকে হেঁটে যেতে ১৫ মিনিটের বেশি লাগবেনা। আমি রওনা দিলাম।

***

মারাত্মক অবাক হলাম!

হামিদের অফিসে গিয়ে দেখি কানিজ বসে আছে। আমাকে দেখে হাসলো। হামিদও দেখি দাঁত কেলিয়ে হাসছে!

“কিছু মনে করিস না দোস্ত! আসলে কানিজ এসে এক প্যাকেট ব্যানসন ঘুষ দিল, আমি আর মিথ্যে না বলে পারলাম না”।

কানিজ বললো, “আরে… ওকে চিনেন না হামিদ ভাই? এক্ষুনি বলে বসবে একদমই অবাক হইনি, আমি জানি কানিজ এখানেই আছে!”

আমি হাসলাম, “না, আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। তুমি হঠাৎ এখানে?”

“না এসে উপায় কি? তুমি তো ফোন ধরছ না! তাই বাধ্য হয়ে হামিদ ভাইকে ধরতে হল”।

হামিদ বললো, “বস দোস্ত ! চায়ের অর্ডার দিছি”।

***

হামিদের অফিস থেকে বেরিয়েছি আধাঘণ্টা আগে। এখন বসে আছি চারুকলার ভেতর। কানিজ বসে আছে আমার পাশে। সেই তখন থেকে আমার একটা হাত ধরে আছে। এক মুহূর্তের জন্য ছাড়ছেনা।

“একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি”। কানিজ বলল।

“কি সিদ্ধান্ত?”

“আমরা বিয়ে করব”।

আমি শব্দ করে হাসলাম।

“তোমার হাসি পাচ্ছে? আমি কিন্তু সিরিয়াস’।

“হঠাৎ বিয়ের ভুত মাথায় চাপল কেন?”

“হঠাৎ না, অনেক দিন আগে থেকেই ভাবছি। তোমাকে শক্ত করে আমার সাথে বাঁধতে হবে। যাতে তুমি এভাবে হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে না পার”।

“তা না হয় হলো। কিন্তু তারপর কি করবে?”

“হুট করে বিয়ে করে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। আমার মনে হয় বিয়েটা সেড়ে ফেললে বাবা মেনে না নিয়ে পারবেন না।”

“যদি মেনে না নেয়?”

“তাহলে তোমার হাত ধরে বেরিয়ে আসব”।

“আমার হাত ধরে? আমি তোমাকে রাখব কই? আমার নিজেরই তো থাকার যায়গা ঠিক নাই”।

“দরকার পড়লে গাছ তলায় থাকব”।

আমি আবার হাসলাম, “এইগুলা পুরনো সিনেমার ডায়লগ কানিজ! ‘গাছতলায় থাকব’ বলা আর করাটা এক জিনিস না”।

“আমার কাছে একই”। জোর দিয়ে বলল কানিজ।

আমি আর কিছু বললাম না। কানিজ জেদি মেয়ে। তার সাথে তর্ক করে লাভ নেই।

“ব্যপারটা কিন্তু খারাপ হয় না! ভেবে দেখ! আমি গাছ তলায় তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকব। আর তুমি আমার পাশে বসে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখবে”।

আমি টিটকারির ভঙ্গিতে হাসলাম। “শুধু কবিতাতে কি পেট ভরবে? খাবার জোগাড় করতে হবেনা?”

“ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা। আমি তোমার চাকরির ব্যপারে কথা বলে রেখেছি”।

আমি অবাক হলাম। “কোথায়? কার সাথে?”

“শহিদ ভাই। আমার কাজিন। তার একটা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট এর বিজনেস আছে”।

“তুমি বললেই তিনি আমাকে চাকরি দিয়ে দেবেন?”

“হ্যাঁ… একটা কারণ আছে অবশ্য”।

“কি?”

কানিজের ঠোঁটে লাজুক হাসি। “শহিদ ভাই আমার প্রেমে পড়েছিলেন। এখনও সম্ভবত পড়েই আছেন। আমি যখন কলেজে পড়ি তখন আমাকে প্রপোজ করেছিলেন”।

“তারপর?”

“তারপর আর কি?” কানিজ ঠোঁট উলটে বলল, “আমি তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ আমার তাকে পছন্দ হয়নি। আমি তো তোমার আগমনের অপেক্ষায় ছিলাম!”

***

সেদিন বিকেলেই কানিজের সাথে তার শহিদ ভাইয়ের অফিসে গেলাম। বিশাল সেই অফিস। হাই ফাই ডেকোরেশন। দেখা করার জন্য রিসিপশনে ৫ মিনিট অপেক্ষাও করতে হল।

আমি ভেবেছিলাম শহিদ ভাই মানুষটা কাল মত, বেঁটে গোছের, আর একটু বেশি বয়সী হবে। তাই কানিজ তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাকে দেখে আমি বিষম খেয়ে গেলাম। দামী স্যুট টাই পড়া টগবগে আর স্বাস্থ্যবান যুবক। সিনেমার নায়ক হওয়ার মতো চেহারা। আমার চেয়ে বছর দুই-তিন বড় হবে হয়তো। কিন্তু এই বয়সে নিজস্ব বিজনেস দাঁড় করিয়ে ফেলেছে!

রুমে ঢুকেই কানিজ বলে উঠল, “আরে… শহিদ ভাই যে! তুমিতো আগের চেয়ে আরও বেশি হ্যান্ডসাম হয়ে গেছ”!

শহিদ সুন্দর করে হাসলেন, “থ্যাংকস কানিজ। বস তোমরা”।

কানিজ আমার সাথে শহিদের পরিচয় করিয়ে দিল।

শহিদ বললেন, “কানিজের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি নাকি দারুন কবিতা লিখেন”!

আমি হাসলাম।

“আমি অবশ্য কবিতা টবিতা তেমন বুঝিনা। ব্যবসায়ী মানুষ”!

শহিদ বেল বাজিয়ে পিয়ন কে ডাকলেন। তিন কাপ কফি দিতে বললেন।

আমি বললাম, “এই বয়সে এত বড় বিজনেস দাড় করালেন কিভাবে?”

শহিদ ভাই হাসলেন। “সে এক লম্বা কাহিনী। আর একদিন বলব”।

“আর একদিন না হয় লম্বা করে বলবেন। আজ একটু খাটো করে বলেন!”

শহিদ আমার রসিকতায় হাসলেন, “ভাইরে, আমার বাবা ছিলেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব। কিন্তু আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পরই বললেন, তোমার পথ তোমাকে নিজের যোগ্যতায় খুজে নিতে হবে। আমি কিন্তু স্বজন প্রীতি করে তোমার চাকরির ব্যবস্থা করে দিবনা! তখন থেকেই আমার মাথায় চিন্তা ছিল-নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বাবার পরিচয়ে বড় হবো না। কিছু ধার কর্য করে স্টুডেন্ট লাইফেই সাহস করে বিজনেসে নেমে পড়লাম। তারপর অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে এতদুর এসেছি”।

আমি শহিদের কথা শুনে অবাক হলাম। একজন হার্ড ওয়ার্কিং মানুষ! এই বয়সে এত বড় বিজনেসের মালিক! দেখতেও দারুন হ্যান্ডসাম! শিক্ষা দীক্ষা সব কিছুতেই আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে। কানিজ কেন এই মানুষটাকে ছেড়ে আমাকে ভালোবাসলো?

শহিদ সাহেব বলছেন, “একটা জিনিস খেয়াল করেছ কানিজ?”

“কি?” কানিজ বলল।

“আমার পুরো অফিসের ইনটেরিওর কালার কিন্তু নীল! তোমার প্রিয় রং!”

কানিজ হাসল, “তোমার গায়ের স্যুটও তো নীল রঙের!”

“হ্যাঁ… শুধু রং টাই সব না, তোমার পছন্দের সব জিনিস দিয়েই সাজিয়েছি আমার অফিস”!

কানিজ একটু বিব্রত বোধ করল। আমার দিকে তাকালো। আমি নির্বাক। কানিজ প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললো, “তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম। মনে আছে শহিদ ভাই?”

“ওহ! …হ্যাঁ। মনে আছে”। শহিদ ভাই আমার দিকে তাকালেন, “অর্ক সাহেব। আপনার চাকরির ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। ইভেন্ট ম্যানেজারের পোস্ট। আপাতত ত্রিশ হাজার টাকা স্যালারি পাবেন। এই মাসেই জয়েন করতে পারেন”।

“জি…আমাকে একটু সময় দিন”। আমি মৃদু হেসে বললাম।

“যত খুশি সময় নিন”। শহিদ ভাই হাসলেন আন্তরিকভাবে। “আমার দুয়ার আপনার জন্য সবসময় খোলা! কানিজের কথা তো আমি ফেলে দিতে পারিনা!”

***

রাত গভীর হয়েছে। আমার চোখে ঘুম নেই। আমি এমনিতেই রাত জাগি। কিন্তু আজ রাত জাগার অন্য একটা কারন আছে!

একটা চিন্তা আমাকে একটু্ও সুস্থির থাকতে দিচ্ছে না। কেন কানিজ আমাকে ভালবাসলো? যেখানে শহিদকে বিয়ে করলে তার জন্য উন্মুক্ত হবে অফুরন্ত সুখের দুয়ার, সেখানে আমার মত চালচুলোহীন ছন্নছাড়াকে বিয়ে করে কেন দুঃখকে আগলে নিতে চাইছে? প্রাচুর্যের মাঝে বড় হওয়া কানিজ কি পারবে আমার অভাবের ঘরে এসে মানিয়ে নিতে? শহিদ এর আচরণ থেকে বুঝা যাচ্ছে সে এখনো কানিজকে ভালবাসে। সে আমাকে দোয়া করে একটা চাকরি দিচ্ছে! আমি কি পারব শহিদের এই দয়ার চাকরিটা করে যেতে? সারাজীবন যে স্বাধীনতা উপভোগ করে এলাম তা বর্জন করে, আমি কি মেনে নিতে পারব এই পরাধীনতার শৃঙ্খল? প্রতিমুহূর্তে কি মনে হবেনা যে আমার যা কিছু সবই এই শহিদের দয়ার দান?

অনেক ভাবনার শেষে একটা সমাধান উকি দিল মনে।

ভোর ৫ টার দিকে ফোন দিলাম হামিদ কে। হামিদ রিসিভ করে তার স্বভাবসুলভ গালি দিল, “কোন শালায় রে?”

***

৫ বছর পর!

এবারের বই মেলায় আমার ৩য় কবিতার বই “দহন” প্রকাশিত হয়েছে। বইটা পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এই বইয়ের জন্য আমি সেরা তরুণ কবি হিসেবে বেশ কিছু সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছি। কানাঘুষা চলছে এই বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কারটাও পেয়ে যেতে পারি!

আমার বইয়ের সাফল্য উপলক্ষে আজ হামিদ তার অফিসে পার্টি ফেলেছে। আমাদের সব বন্ধুবান্ধবরা আসছে।

কিন্তু হামিদের অফিসে ঢুকে দেখলাম ও একাই বসে আছে। আর কেউ আসেনি। হামিদের মুখে কেমন যেন একটা থমথমে ভাব।

“কি ব্যাপার হামিদ? বাকিরা কই?”

“সবাই চইলা আসবে, তুই বস”।

আমি বসলাম। “তোর চেহারা অমন লাগছে কেন? কি হয়েছে?”

“কানিজ আসছিল”।

আমি অবাক হলাম। “তারপর?”

“তোকে দেয়ার জন্য আমাকে একটা চিঠি দিয়া গেছে”।

“কই?”

হামিদ ড্রয়ার খুলে একটা ভাজ করা কাগজ বের করল। “আমি দুঃখিত, তুই আসার আগে চিঠিটা আমি পড়ছি”।

আমি কিছু বললাম না। কাগজের ভাজ খুলে পড়তে শুরু করলাম।

অর্ক,

তোমাকে একটা জিনিস জানানোর জন্য এই চিঠিটি লিখছি। মুখে বলতে পারতাম। কিন্তু তোমার সাথে কথা বলার চিন্তা করতেও আমার ঘৃণা হয়!আগামিকাল আমার ৩য় বিবাহবার্ষিকী। এই উপলক্ষে আমার স্বামী শহিদ চৌধুরী আমাদের গুলশানের বাড়িতে ধুম ধাম করে পার্টির আয়োজন করেছে। গণ্য মান্য সব ব্যাক্তিরা আসবে এই পার্টিতে।

ম্যারেজ ডে উপলক্ষে শহিদ আমাকে কি উপহার দিচ্ছে জান? একটা নীল রঙের গাড়ি! আমার প্রিয় রং!

তুমি ভাবছ তোমাকে দাওয়াত দেয়ার জন্য আমি এই চিঠি লিখছি? কখনই নয়! আমি তোমাকে জানাতে চাই যে আমি কতটা সুখে আছি।

ভাগ্যিস সেদিন হামিদ ভাই আমাকে সব সত্য কথা বলেছিলেন। নইলে তোমাকে আমি চিনতেই পারতাম না! হামিদ ভাইয়ের মত মানুষই হয়না। তিনি আমার জীবনটা ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন। হামিদ ভাই প্রমান সহ আমাকে দেখিয়েছেন যে তুমি বড়লোকের মেয়েদের কবিতা শুনিয়ে শুনিয়ে পটাও, তারপর তাদের ব্লাকমেইল করে টাকা আত্মসাৎ কর। ছি! আমার ভাবতেও লজ্জা হয়, তোমার মত একটা ইতরকে ভালবাসার মত বড় একটা ভুল আমি  কীভাবে করেছিলাম!

শুনলাম তুমি নাকি কবিতা লিখে বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছ! তুমি নাকি এই সময়ের সেরা কবি! ছিঃ আমার ভাবতেও অবাক লাগে তোমার মত একটা ভণ্ডকে কেমন করে পুরস্কৃত করা হয়? আমি যদি সমাজের সবার সামনে তোমার মুখোশ টা খুলে দিতে পারতাম, খুব ভালো লাগতো!

তোমাকে আমি ঘৃণা করি!

ঘৃণা!

ঘৃণা!

ঘৃণা!

পড়া শেষে চিঠিটা ভাজ করে পকেটে নিলাম। কষ্টের একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসতে চাইছিল। অনেক কষ্টে সেটা আটকালাম। বুকের ভেতর কোথায় যেন ব্যথা হচ্ছে! প্রচণ্ড ব্যাথা!

“তোর খারাপ লাগছে না?” হামিদ বলল।

“কেন খারাপ লাগবে?” আমি অন্যদিকে ফিরলাম। কে জানে? হয়ত চোখ ছল ছল করছে! কিন্তু হামিদকে সেটা দেখানো যাবেনা!

“কারন তুই কানিজ কে অনেক ভালবাসিস অর্ক”!

“কে বলেছে তোকে?”

“কে বলছে?” হামিদ রেগে গেল। “বলছে তোর কবিতার বই! বলছে তোর গায়ের পাঞ্জাবী! আরে… তোর সব বইয়ের প্রচ্ছদ নীল রঙের হয় কেন? তুই সব সময় নীল রঙের পাঞ্জাবী পড়ে থাকিস কেন?”

আমি বিড় বিড় করে বললাম, “আমার তো নীল রঙের গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই! তাই বইয়ের প্রচ্ছদে নীল রং লাগাই”।

“কানিজ কি নীল গাড়ি চেয়েছিল?” রেগে গেলো হামিদ। “সে তো তোর ঐ নীল প্রচ্ছদের কবিতার বইটা বুকে চেপে জীবন কাটিয়ে দিতে রাজি ছিলো! কেন তাকে সেই সুযোগটা তুই দিলি না?”

আমি আর কিছু বললাম না। মাথা নিচু করে নিলাম।

“আমার দিকে তাকা অর্ক”!

আমি তাকালাম হামিদের দিকে।

“তোর প্ল্যান মতো মিথ্যা বলছি আমি! ফুলের মত নিষ্পাপ মেয়েটার কাছে মিথ্যা বলছি আমি! অনেক বড় পাপ করিয়েছিস আমাকে দিয়ে! আল্লাহ তোকে কোনও দিন ক্ষমা করবেনা”।

“আমি জানি”। আমার দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামছে। ভিজে যাচ্ছে পাঞ্জাবির বুকের অংশ।

“মাঝে মাঝে মনে হয়…” হামিদের চোখ ছল ছল করছে। বুঝতে পারছি কথাগুলো বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার, “মনে হয়… দৌড়ায় গিয়া সব সত্যি কথা বলে দেই মেয়েটাকে”।

“না… হামিদ!” আমি আঁতকে উঠলাম। “এটা করিস না! মেয়েটাকে সুখে থাকতে দে।”

“সুখ? এইটাকে তুই সুখ বলিস? জানিস ও এখনো তোকে কতটা ভালবাসে? তুই কি মনে করিস তোকে হারিয়ে সে সুখে আছে?”

“হারিয়েছে আমাকে। কিন্তু পেয়েছে অনেক কিছু”। নিস্প্রান কণ্ঠে বললাম আমি। “আলিসান বাড়ি, দামী গাড়ি, হ্যান্ডসাম স্বামী আর কাড়ি কাড়ি টাকা! কত কিছু পেয়েছে সে! এসবের তুলনায় আমার ভালোবাসা খুবই সামান্য!”

হামিদ নাছোড়বান্দার মতো বললো, “বুঝলাম কানিজ অনেক কিছু পেয়েছে! কিন্তু তুই কি পেলি?”

আমি জোর করে একটু হাসার চেষ্টা করলাম, “আমি তো কিছু পেতে চাইনি রে! শুধু হারাতে চেয়েছি! হারানোর ব্যথা নিয়ে জ্বলে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে-আমি কবি হবো! সত্যিকারের কবি!”

(সমাপ্ত)

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি