ছোট গল্প

লাল কাতান

বাসে চেপে দূরে কোথাও যাওয়ার পথে সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার কি ঘটতে পারে ভাবুন তো? অনেকেই হয়তো ভাবছেন “বাসের টায়ার পাংচার হওয়া” কিংবা “মারাত্মক ট্রাফিক জ্যামে পড়া”। কিন্তু তারচেয়েও বেশি বিরক্তিকর কারণ হতে পারে- একজন বাঁচাল ব্যক্তির পাশের সিটে বসা। আজ আমার কপালে ঠিক তাই ঘটেছে। বসেছি এক বিরক্তিকর লোকের পাশে। সারাক্ষণ বকবক করেই চলেছে। ঘন্টা দুয়েক হলো রওনা হয়েছি, এরই মধ্যে তার নাড়ি-নক্ষত্র সব জানা হয়ে গেছে আমার। বাকিটা পথও মনে হচ্ছে জ্বালিয়ে মারবে!

আমি একজন সরকারি ম্যাজিস্ট্রেট। বিশেষ একটা কাজে খুলনায় যাচ্ছি। আমার যাতায়াতের জন্য অবশ্য সরকারি বিশেষ গাড়ি রয়েছে। গাড়িটা হঠাৎ করে বিকল হলো, হাতেও বেশি সময় নেই, তাই বাসে চেপেই রওনা হয়েছি। কিন্তু এই ব্যাক্তির বকবকের জ্বালায় মন চাচ্ছে এক্ষুনি বাস থেকে নেমে ঢাকায় ফেরার পথ ধরি!

লোকটার নাম গফুর মিয়া। বয়স ত্রিশের আশে পাশে হবে, মাথায় টাক পরে গেছে। একটা ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড সে। বেতন পায় বিশ হাজার টাকা। খুলনার খালিশপুরের এক গ্রামে তার বাড়ি। বিয়ে করেছে বছর তিনেক হয়েছে। এখনও বাচ্চা কাচ্চা হয়নি। বউ ছাড়াও বাড়িতে বুড়ো মা, বড় দুই ভাই, তাদের বউ আর বাচ্চারা রয়েছে। এবার ঈদে সবার জন্য ঢাকা থেকে কেনা কাঁটা করে বাড়ি ফিরছে। খুব খুশী লাগছে তার। সবচেয়ে বেশি খুশী লাগছে কারণ বউয়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে পেরেছে। লাল রঙের কাতান শাড়ি। মিরপুরের বেনারশি পল্লী থেকে একদামে কেনা, সাড়ে ৬ হাজার টাকা! ২০ হাজার টাকা মাইনে পাওয়া লোক বউয়ের জন্য সাড়ে ৬ হাজার খরচ করে শাড়ি কিনেছে শুনে খুব অবাক হলাম আমি! ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করেই বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি! পাক্কা দুই ঘন্টার কাহিনী শোনা লাগবে এবার।

গফুর মিয়া অবশ্য খুব মজা করে কথা বলতে পারে। কীভাবে শেফালির সাথে পরিচয় হলো, প্রেম হলো, বিয়ে হলো- সব একে একে বলে গেলো। শেফালি বড়লোক বাপের মেয়ে, মেয়ের জামাই হিসেবে শেফালির বাবা গফুরকে কিছুতেই মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে বিয়ে দিয়েছেন। গফুর মিয়ার সংসারে এসে শেফালি সুখ পায়নি। অভাবের সংসারে দুই বেলা ঠিক মতো খেতে পায় না, তার উপর আবার গফুরের বড় ভাই- ভাবীদের লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করে যাচ্ছে। শেফালীর নাকি খুব শখ ছিল লাল রঙের কাতান শাড়ি পড়ে বিয়ে করবে। কিন্তু অভাবী গফুরের পক্ষে তা কিনে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সে কিছু কিছু করে টাকা আলাদা করে রাখতে শুরু করে শাড়ি কেনার জন্য। অবশেষে ভালো একটা শাড়ি কেনার সামর্থ্য তার হয়েছে!

“শফিক ভাই, মেলাক্ষন ধইরা নিজের সম্পর্কে বকবক করতাছি। আপনার সম্পর্কে তো কিছুই জানা হইলো না!”

আমি সৌজন্য দেখিয়ে হাসলাম, “আমার নাম তো বলেছি- শফিক আহমেদ। সরকারি চাকরি করি। একটা কাজে খুলনায় যাচ্ছি। খুলনায় আমার নানারবাড়ি। ভাবছি ঈদটাও সেখানেই কাটিয়ে ফিরবো”।

“কি সরকারি চাকরি?” কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো গফুর মিয়া।

“ম্যাজিস্ট্রেট”।

“ইয়া আল্লাহ! আমি কার পাশে বইছি!” গফুরের চোখ যেন কপালে উঠলো। “স্যার! অনেকক্ষণ ধইরা আপনারে জ্বালাইতাছি। আমারে মাফ কইরা দেন”।

“আরে না না! ইটস অলরাইট”। আমি হাসিটা ধরে রেখে বললাম।

আমার মুখের হাসি দেখেও গফুর আশ্বস্ত হতে পারলো না। বক বক করা বন্ধ করে দিলো। বেচারা মনে মনে ঘাবড়ে গেছে! যাক, ভালোই হলো। মনে হচ্ছে বাকিটা পথ শান্তি মতো যাওয়া যাবে।

আমি জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে থাকলাম। বাসের একটানা দুলুনিতে ঘুম ঘুম ভাব চলে এলো। মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলাম। কখন যে চোখ লেগে গেলো টেরই পেলাম না! ঘুমের ঘোরে একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম আমি। আমাকে গফুর জোর করে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেলো। তার মা, স্ত্রী, ভাই-ভাবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। গফুরের স্ত্রী অল্পবয়সী, অসম্ভব সুন্দরী। গফুর ব্যাগ খুলে একটা লাল কাতান শাড়ি বের করে স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দিলো। মেয়েটির খুশী দেখে কে? দৌড়ে এই ঘর থেকে ঐ ঘরে যাচ্ছে আর সবাইকে শাড়িটা খুলে দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে!

স্বপ্ন দেখতে দেখতে গভীর ঘুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি এমন সময় কানের কাছে ফিসফিস শব্দ শুনতে পেলাম- “স্যার! ও স্যার!”

সম্ভবত গফুর মিয়া ডাকছে। আমি চোখ খোলার প্রয়োজন মনে করছি না। খুললেই এই ব্যাটা আবার গাল-গল্প শুরু করবে।

“স্যার! উঠেন স্যার! বাসে ডাকাত পড়ছে”।

“ডাকাত” শব্দটা শুনতেই আমার ঘুম ঘুম ভাব কেটে গেলো। চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলাম। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় প্রথমে চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা দেখলাম। বাসের সামনের দিকে একজন ক্যানভাসার দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলছে। হাতে কিছু একটা ধরে রেখেছে, দেখাচ্ছে সবাইকে। পিঠে বড় আকৃতির ঝোলা।

কয়েকবার চোখ পিট পিট করতেই সব পরিস্কার হয়ে এলো। বাসটা থেমে আছে একটা হাইওয়ে রোডের পাশে। ড্রাইভার আর কন্টাক্টরকে দেখলাম যাত্রী সিটের সামনের দিকে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার হাতে একটা পিস্তল নজরে এলো আমার। সাথে সাথে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। বুঝলাম ক্যানভাসারের ছদ্মবেশে বাসে একজন ডাকাত উঠে পড়েছে।

“সাবধান!” হুংকার দিলো লোকটা। “কেউ নড়া চড়ার চেষ্টা করলেই গুলি কইরা দিমু। আমি আজম ডাকাইত! আমার মনে কইলাম মায়া দয়া কিচ্ছু নাই!”

বাসের ভেতর মহিলারা চাপা কণ্ঠে কাঁদছে। দুই একটা বাচ্চাও ভয়ে চিৎকার করছে।

“আমি একে একে সবার সামনে যামু। মোবাইল, মানিব্যাগ, স্বর্ন-গহনা- যার কাছে যা আছে সব আমার ব্যাগের ভিতর দিয়া দিবি। কোন ঝামেলা করলেই ডাইরেক্ট গুলি খাবি!”

লোকটা বাসের একদম শেষ মাথায় চলে গেলো। সেখান থেকে সবার মূল্যবান জিনিস ঝোলায় ভরতে ভরতে সামনের দিকে এগিয়ে এলো। মোবাইল মানিব্যাগ মহিলাদের গহনা তো নিচ্ছেই, সেই সাথে কাপড়ের ব্যাগ খুলে ভেতরে দামি কাপড়–চোপড় কিছু দেখলে সেগুলোও নিয়ে নিচ্ছে!

আইনের লোক হয়ে চোখের সামনে এমন একটা দৃশ্য দেখতে আমার খুব খারাপ লাগছে। খেঁটে খাওয়া মানুষগুলো টাকা জমিয়ে প্রিয়জনদের জন্য নতুন কাপড় কিনেছে। তাই নিয়ে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছে। পথে সবকিছু এভাবে ডাকাতি হয়ে যাবে তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেনি!

পাশে তাকিয়ে দেখলাম সহযাত্রী গফুরের চেহারা শুকিয়ে পাংশু বর্ণ ধারন করেছে। ভয়ে হাত পা কাঁপছে তার। লোকটার জন্য মায়া হচ্ছে খুব। কিন্তু কি করার আছে আমার? ঐ ডাকাতের হাতে ধরা পিস্তলের সামনে আমিও অসহায়।

এদিকে ডাকাত লোকটা ঝোলার ভেতর মানুষের সর্বস্ব ভরতে ভরতে সামনে এগিয়ে আসছে। কেউ কেউ দিতে চাইছে না, ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না করছে, দয়া করতে বলছে। ডাকাত আজমের মধ্যে দয়া দেখানোর কোন লক্ষণ দেখছি না। সে সারাক্ষণ চিৎকার করছে আর কেউ ঝামেলা করলেই পিস্তল দিয়ে তাদের মুখে কিংবা মাথায় আঘাত করছে।

আজম ডাকাতের পিস্তল ধরা হাতের দিকে ভালো করে লক্ষ করলাম আমি। পিস্তল ধরার ভঙ্গিটা কেমন যেন আনাড়ি গোছের। আমার মাথার ভেতর দ্রুত গতিতে চিন্তা চলছে। আচরণে মনে হচ্ছে পাকা ডাকাত, অনেকদিন যাবত এই লাইনে আছে, কিন্তু পিস্তল ধরেছে আনাড়ির মতো। সম্ভবত গুলি করতে অভ্যস্ত সে!

আজম ডাকাত চলে এসেছে আমাদের কাছাকাছি। গফুরের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। আমি তাকে শান্ত করার জন্য বললাম, “গফুর মিয়া, শান্ত হও”।

গফুর আমার দিকে ফিরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, “স্যার! আপনে না ম্যাজিস্ট্রেট? কিছু করেন স্যার! আমার সারা বছরের সঞ্চয় লইয়া বাড়ি যাইতাছি। ডাকাইতে নিয়া গেলে পথে বসুম!”

কি বলব বুঝতে পারছি না আমি। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। ম্যাজিস্ট্রেট হই আর যার হই। আমি তো সাথে অস্ত্র নিয়ে ঘুরি না। একজন ডাকাতের হাতের পিস্তলের সামনে আমার কিই বা করার আছে?

“ঐ টাকলু, জলদি যা আছে বাইর কর”। গফুরের ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল ডাকাত আজম।

গফুর কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে মানিব্যাগ আর মোবাইল বের করে দিয়ে দিলো।

“দেখি, পকেট উল্টায় দেখা”।

গফুর লুকিয়ে মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা পকেটে রেখে দিয়েছিলো। সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “পকেটে কিছু নাই তো”।

“হারামযাদা! পকেট উদাম কইরা দেখা!”

গফুরের দুচোখ টলমল করছে। সে পকেট থেকে কয়েকটা হাজার টাকার নোট বের করে ডাকাতের ঝোলার ভেতর ফেলে দিলো।

ডাকাত হাসি মুখে বলল, “এইবার ব্যাগটা খোল। দেখি কি আছে”।

“ভাই পুরান কাপড় চোপড়। আপনের কোন কাজে আসব না”। গফুর মিনমিনে কণ্ঠে আপত্তি জানালো।

“ব্যাগের চেইন খোল দেখি”।

“কইলাম তো ভাই, তেমন কিছু নাই”।

আজমের চোখ দুটো রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। “কুত্তার বাচ্চা চেইন খুলবি নাকি গুলি ভইরা দিমু?”

গফুর তার কোলের উপর ফেলে রাখা ব্যাগের চেইন টেনে খুলল। ভেতরে উকি দিলো কিছু ব্যবহৃত কাপড় চোপড়, কিছু শপিং ব্যাগ আর একটা শাড়ির প্যাকেট।

“শাড়িটা দে”।

“না ভাই! এইটা নিয়েন না!” গফুর এবার কেঁদেই ফেললো। “এইটা আমার বউয়ের লেইগা কিনছি”।

“দে কইতাছি”।

গফুর হাউমাউ করে বললো, “ডাকাত ভাই! আপনে আমার ধর্মের ভাই লাগেন! এইটা নিয়েন না! আমি দুই বছরের টাকা জমাইয়া এই শাড়িটা কিনছি। এইটা নিয়েন না গো ভাই!”

“হারামযাদা, টাইম নষ্ট করিস না আমার!”

গফুর নাছোড়বান্দার মতো বলল, “আপনে গুলি করতে চাইলে করেন! কিন্তু এইটা আমি দিমুনা! কিছুতেই দিমুনা!”

বাসসুদ্ধ লোক হতবাক হয়ে গেছে কান্ড দেখে। এই লোক সামান্য একটা শাড়ির জন্য জানের মায়া করছে না!

আমি আস্তে করে পাশ থেকে বললাম, “এই গফুর! দিয়ে দাও শাড়িটা!

“না ভাই! আমি মইরা গেলেও এইটা দিমু না”।

আজম ডাকাত পিস্তলের বাট দিয়ে গফুরের মুখে আঘাত করলো। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট কেটে গিয়ে গফুরের মুখের সামনে অংশটা রক্তাক্ত হয়ে উঠলো। ব্যাথায় “উহ” করে উঠলেও প্রানপনে আঁকড়ে ধরে রেখেছে ব্যাগটা। কিছুতেই শাড়ি নিতে দিবে না।

আজম ডাকাতের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে দেখতে পাচ্ছি। বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছে লোকটা! চোখে খেলা করছে খুনের নেশা! মনে হচ্ছে যেকোনো মুহুর্তে গুলি করে দেবে!

পেছন থেকে একটা লোক ভয় ভয় কণ্ঠে বলল, “ভাই, একটা শাড়ির জন্য এমন করতাছেন কেন? দিয়া দেন!”

গফুর ভাঙা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো, “এইটা যেমন তেমন শাড়ি না… এইটা একটা লাল কাতান… আমার বউয়ের লেইগা কিনছি। আমার বউটা জীবনে আর কিছুই চায় নাই আমার কাছে… এই শাড়ি বাড়িতে নিয়া যাইতে না পারলে আমার বাইচা থাকার কোন দরকার নাই!”

দেখে মনে হছে ডাকাত আজম কেমন যেন ভড়কে গেছে। তার পিস্তল ধরা হাত কাঁপছে। গুলি করবে বলে বার বার শাসাচ্ছে কিন্তু গুলি করছে না! তারমানে আমার ধারণাই ঠিক! এই লোক সম্ভবত জীবনে গুলি করে নাই। গুলি করার হলে তো এতক্ষনে করেই দিতো। তার মতো নির্দয় ডাকাত এতোক্ষন অপেক্ষা করতো না! এর অর্থ একটাই– হাতের পিস্তলটা নকল! এতোদিন তাহলে নকল পিস্তল দেখিয়ে মানুষকে লুট করছে সে। আর মানুষ ভয় পেয়ে সব তার হাতে তুলে দিয়েছে। গুলি খাওয়ার ঝুঁকি কে নিতে চায়? কিন্তু ডাকাত আজমের মনে হয় কখনও ভাবেনি যে সামান্য একটা শাড়ির জন্য কেউ এমন পাগলের মতো আচরণ করতে পারে!

পিস্তলটার দিকে কাছ থেকে ভালো করে তাকাতেই বুঝলাম আসলেই একটা রেপ্লিকা পিস্তল! আমার সাহস বেড়ে গেলো। ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম।

আজম ডাকাত নড়ছে না। কেমন যেন জমে গেছে মনে হচ্ছে।

আমি টিটকারির ভঙ্গিতে বললাম, “নকল পিস্তল দেখিয়ে এতদিন ভালই টু পাইস কামিয়েছ আজম! এবার তোমার খেল খতম”।

ডাকাত আজম আমার দিকে তাকালো। আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পা উচু করে লাথি ঝাড়লাম তার হাত লক্ষ করে। হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেলো। লোকটা হতভম্ব হয়ে পড়েছে! আমি সেই সুযোগে গফুর মিয়ার উপর দিয়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আজমের উপর। বাসের মেঝেতে পড়লাম দুজনে। আজম আমার সাথে ধস্তাধস্তি শুরু করলো। কিন্তু এক হাতে তার গলা ভীষণ জোরে পেচিয়ে ধরেছি বলে সে বিশেষ সুবিধা করতে পারলো না। আমি সেই অবস্থায় বাসের যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বললাম- “ভাই, কেউ ভয় পাবেন না! আমি একজন সরকারি ম্যাজিস্ট্রেট! এই লোকের হাতের পিস্তলটা নকল ছিলো। সে ভয় দেখিয়ে টাকা নেয় লোকের কাছ থেকে!”

এবার বাসের পুরুষরা সবাই এগিয়ে এলো। আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গেলো আজম ডাকাতকে। বেধড়ক পিটুনি দিতে শুরু করলো। আমি উঠে দাঁড়িয়ে আজমের নকল পিস্তলটা কুড়িয়ে পকেটে নিলাম। দেখলাম অবস্থা বেগতিক! এইভাবে গনপিটুনি খেলে আজম ডাকাত মিনিট খানেকের মধ্যেই মরে যাবে!

আমি সবার উদ্দেশ্য বললাম- “ভাই আপনারা থামেন! এভাবে মারলে সে মরে যাবে! আমরা আজম ডাকাতকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। তারাই যা করার করবে!”

লোকজন থামলো। আজম ডাকাতকে টেনে নামানো হল বাস থেকে। রাস্তার পাশে একটা গাছের সাথে শক্ত দড়ি দিয়ে কষে বাঁধা হলো। লোকটাকে আর চেনাই যাচ্ছে না! পাবলিকের মার খেয়ে তার চোখ মুখ রক্তাক্ত। শরীরের জামা কাপড় ছিড়ে একাকার। চুল তুলে নিয়ে গেছে মাথার এক পাশ থেকে! বুকের উপর মাথাটা ঝুলে পরেছে। হাঁপাচ্ছে হাঁপানি রোগীদের মতো।

আমি আজমের ঝোলাটা খুলে বললাম- “যার যার জিনিস নিয়ে নিন”।

সবাই হুড়োহুড়ি করে নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে নিলো। ড্রাইভারের কাছ থেকে যায়গাটা চিনে নিয়ে আমি ডিরেক্টরি ঘেঁটে স্থানীয় থানার ফোন নম্বর বের করে ফোন দিলাম।

ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে বললো, “হ্যালো, ডিউটি অফিসার মামুন বলছি”।

“আমি ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম খান বলছি”।

অফিসার খুব অমায়িক কণ্ঠে বললেন, “জি বলুন, কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”

“অফিসার মামুন, আমি আপনার থানার কাছাকাছি হাইওয়ে রোডে আছি। আমরা একটা বাসে করে যাচ্ছিলাম। এমন সময় বাসে ডাকাত পড়ে”।

“বলেন কি?”

অফিসার খুব একটা চমকালেন বলে মনে হচ্ছে না! অর্থাৎ এই এলাকায় বাসে ডাকাতি হওয়াটা নতুন কিছু না। আমি বললাম, “বাসের লোকদের সহায়তায় আমি ডাকাতকে ধরে ফেলেছি। লোকটা নিজেকে আজম ডাকাত বলে পরিচয় দিয়েছে”!

“আজম ডাকাত!” এবার চমকে উঠলেন অফিসার মামুন। “সে তো এলাকার ত্রাস! অনেক দিন যাবত তাকে ধরার চেষ্টা করছি আমরা”।

“তাকে আমরা বেঁধে রেখেছি। আপনি দ্রুত ফোর্স নিয়ে চলে আসুন”।

আমি ড্রাইভারকে বললাম, “আপনারা বাস নিয়ে চলে যান। আমি ডাকাতকে পুলিশে দিয়ে পরে ফিরব”।

গফুর আমার সাথে থাকতে চাইলো। আমি অনেক আপত্তি করলেও সে শুনলো না। তার অনেক বড় উপকার করেছি আমি। তাই সে আমাকে একা রেখে যাবে না! আজমকে পুলিশের হাতে দিয়ে আমার সাথে বাড়ি ফিরবে।

অফিসার বলেছেন তার আসতে ১৫ মিনিটের মতো সময় লাগবে। এই ১৫ মিনিট কি করে সময় কাটানো যায়, তাই ভাবছি। গফুর তার ব্যাগ খুলে শাড়ির প্যাকেটটা বের করেছে। পরম যত্নে ধরে রেখেছে বুকে। সত্যিই লোকটার বউয়ের প্রতি ভালোবাসা অবাক হওয়ার মতো!

আমি নকল পিস্তলটা বের করলাম পকেট থেকে। কি জিনিস বানিয়েছে লোকে, একেবারে অরিজিনাল পিস্তলের মতো দেখতে! আমি এক চোখ বন্ধ করে একটা গাছের দিকে পিস্তলের নিশানা করলাম। গুলি করার ভান করছি। ট্রিগার টেনে দিলাম।

ঠাশ!!!

আকাশ বাতাস কাপিয়ে গুলির শব্দ হলো!

আমি ভয়ে চমকে উঠে হাত থেকে পিস্তল ফেলে দিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না আমার! এটা আসল পিস্তল! এবং পিস্তলে গুলি ছিলো! তাহলে আজম ডাকাত গুলি করলো না কেন? এদিকে গফুরও ঘাবড়ে গিয়ে তাকিয়ে আছে রাস্তায় পরে থাকা পিস্তলের দিকে।

আমি তাকালাম আজমের দিকে। সে মাথা তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসছে। রক্তাক্ত মুখে সেই হাসি দেখাচ্ছে ভয়ংকর!

“তু… তুমি গুলি করলে না কেন?” আমার প্রশ্ন।

কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।

আজম ডাকাত নিচু কণ্ঠে বললো, “বিয়ার সময় আমার বউরে আমি একটা লাল কাতান দিছিলাম… শাড়িটা তার খুব শখের ছিলো! একদিন জুয়া খেলার লেইগা হেই শাড়িটা আমি বেইচ্চা দিলাম… বউ আমার এই দুঃখ সইতে পারে নাই! কুয়াতে ঝাঁপ দিয়া মইরা গেলো!”

আরও কয়েক সেকেন্ড নীরবে কেটে গেলো।

আজম গফুরের দিকে তাকিয়ে বললো, “এই লোকটার মুখে লাল কাতানের কথা শুইনা বউয়ের চেহারাটা চোখের সামনে ভাইসা উঠলো। আমি আর গুলি করবার পারি নাই!”

কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম আমি। আসলে কি বলা উচিত বুঝতে পারছি না। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে মেঘ করেছে, বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

আচ্ছা, আকাশটা আজ এতো লালচে দেখাচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে যেনো সূর্যটাকে কেউ একটা লাল কাতান দিয়ে ঢেকে দিয়েছে!

 

(সমাপ্ত)

মন্তব্য করুন

About the author

নাজিম উদ দৌলা

নাজিম উদ দৌলা একজন তরুণ ও উদীয়মান থ্রিলার লেখক। পেশায় ডিজিটাল মার্কেটিং স্পেশালিস্ট হলেও অবসর কাটে লেখালেখি করেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই লিখছেন অনেক দিন যাবত। এ পর্যন্ত ৫টি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছেন তিনি যা পাঠক মহলে ব্যপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি থ্রিলারধর্মী ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইলঃ https://www.facebook.com/zimbd

পোষ্ট ক্যাটাগরি

ফেসবুকে আমি